কোচ বনাম ম্যানেজার

Print Friendly and PDF

সাইমন মোহসিন

ক্লাব পর্যায়ের সফল ম্যানেজার পেপে গার্দিওলা। সম্প্রতি তিনি বলেছেন যে ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের কোচ হতে আগ্রহী তিনি। কিন্তু তার বর্তমান ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেছেন তিনি। আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের দায়িত্ব নিতে চাইলেও ম্যানসিটির চুক্তি সম্পন্ন করার পরই সেটা পারবেন তিনি। আর সেটা হবে পরবর্তী বিশ্বকাপের প্রায় ছয়মাস আগে। আর্জেন্টিনাও পেপে গার্দিওলাকে দলের কোচ হিসেবে পেতে আগ্রহী এমন খবর শোনা গিয়েছে। কিন্তু, একজন ক্লাব ম্যানেজার আর একজন জাতীয় দলের কোচের ভূমিকা, তাদের প্রতি প্রত্যাশা, এবং তাদের যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয় তা পুরোপুরি ভিন্ন।
ব্যর্থতার জন্য কোচের ওপর প্রকোপটা কতখানি পড়তে পারে সেটা এবারের বিশ্বকাপে জার্মানির জোয়াকিম লো এবং আর্জেন্টিনার সাম্পাওলির অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়। লুই ফিলিপে স্কলারি, ডেল বস্ক, পেহেরা, বেকেনবাওয়ার, কিংবা ২০১৪ সালে জোয়াকিম লো’র কথা স্মরণ করলেই সফলতার পর একজন কোচ কতখানি মান-সম্মান পেতে পারেন সেটাও উপলব্ধি করা যায়।
এটা তো পরিষ্কার যে জাতীয় দলের কোচের ওপর চাপ, প্রত্যাশা একজন ক্লাব দলের ম্যানেজারের চেয়ে অনেকগুণ বেশি থাকে। আর এর নেপথ্যে কেবল সমগ্র জাতির প্রত্যাশাই নয় আরও কিছু বিষয় বিদ্যমান যাকে। ক্লাব ম্যানেজাররা অনেক বিষয়ে জাতীয় দলের কোচদের তুলনায় অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করেন। ক্লাব ম্যানেজাররা দলের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অন্যান্য অনেক দিক থেকে সহযোগিতা ও সুবিধাও পেয়ে থাকেন। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থের জোর।
ক্লাব ফুটবলে অর্থ কথা বলে! দলের কোনো পজিশনে কোনো দূর্বলতা দেখার সঙ্গে সঙ্গে টাকশালে হাত দিয়ে প্রয়োজনীয় নতুন খেলোয়াড় কিনে ফেলতে পারেন। কে দলে থাকবে আর কে বের হয়ে যাবে এই সিদ্ধান্তে ক্লাব ম্যানেজারগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমনটি হওয়ার নয়। খেলোয়াড়ের জাতীয়তা পরিবর্তন সম্ভব নয়। অর্থাৎ জাতীয় দল ও কোচের যা আছে তা নিয়েই কাজ করতে হয়। সুতরাং, সফলতা, বিশেষ করে ম্যাচের দিন, দলের ঐক্য ও সার্বিক দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। সমস্যার সমাধানে কোচকে নিজ প্রজ্ঞা ও দলের কৌশলগত নৈপুণ্যের ওপরই নির্ভর করতে হয়। আর এজন্যই অনেকের কাছে এখনো আন্তর্জাতিক ফুটবল অর্থের প্রভাব থেকে অমলিন থেকে ফুটবলের প্রকৃত সৌন্দর্যকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছে।
যেহেতু যখন-তখন নতুন খেলোয়াড় কিনে দলের দুর্বলতা দূর করার উপায় নেই, এজন্য আন্তর্জাতিক কোচ একটি সুশৃঙ্খল দল গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ক্লাব পর্যায়ে খেলোয়াড়রা সপ্তাহের পর সপ্তাহব্যাপী একসঙ্গে প্রশিক্ষণ করেন, ম্যাচ খেলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোচদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করার পর পুরো দলকে একসঙ্গে পেয়ে প্রশিক্ষণ ও পর্যালোচনার সুযোগ পেতে হয়। তাও আবার হয়তো একনাগাড়ে একমাসের জন্য।
জাতীয় দলে আগত খেলোয়াড়রা আবার সেই দলে সেই পজিশনের শ্রেষ্ঠতম খেলোয়াড়। দেশের সেরা তারকাপুঞ্জির সমারোহ ঘটে জাতীয় দলে। আর এজন্যই জাতীয় দলের কোচদের শুধু খেলোয়াড়ের দক্ষতাই নয়, তারকাদের অহং সামলানোর কঠিন কাজটাও করতে হয়। এটা করতে যে কতটা ধৈর্য ও দৃঢ়তার প্রয়োজন তা বোঝানোর প্রয়োজন নেই। ক্লাব ম্যানেজারদের ক্ষেত্রেও এটা সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু তাদের পক্ষে খুব সহজেই সমস্যা সৃষ্টিকারীকে আরেক দলের কাছে বিক্রি করে নতুন আরেকটি তারকাকে দলে নিয়ে আসা কঠিন কিছু নয়।
অন্যদিকে, জাতীয় দলের কোচ এমনটা করতে পারেনই না। বরং এরই সঙ্গে তাদের আরেকটি সমস্যার মোকাবিলা প্রায়ই করতে হয়। একজন খেলোয়াড় হতাশা বা বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়লেও কোচকেই তা সামলাতে হয়।
ক্লাব পর্যায়ে একটি ম্যাচ খেলতে না পারলে খেলোয়াড়ের তেমন কিছু যায় আসে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি ম্যাচ খেলতে না পারাটা বেশ হতাশাব্যঞ্জক হতে পারে। ক্লাব জার্সি গায়ে দিয়ে খেলোয়াড়রা প্রতি বছর অহরহ মাঠে নামতে পারেন। আজ এই ক্লাব কাল না হয় ঐ ক্লাব- এটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু জাতীয় দলে সেটা সম্ভব নয়। বছরে হয়তো একটি প্রতিযোগিতা যেখানে হাতে গোনা কয়েকটা ম্যাচ খেলার সুযোগ আসে। দেশের জার্সি গায়ে জড়িয়ে খেলার সুযোগ একবার হাতছাড়া হলে আবার ফিরে নাও আসতে পারে। একটি ম্যাচে খেলতে না পারলে পরের ম্যাচে খেলার সুযোগ হবে নাকি না, সেই দুশ্চিন্তায় খেলোয়াড়ের বিষাদগ্রস্ত হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আর পরের ম্যাচের আগে, অন্তত ম্যাচের প্রথম ১১ জন নিশ্চিত করার আগে, কোচের সবাইকে উজ্জীবিত রাখতে হয়। পরের ম্যাচে সেই বিষাদগ্রস্ত খেলোয়াড়ের স্বীয় দক্ষতাই দলীয় কৌশলের চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে!
ক্লাব পর্যায়ে আবার আরেকটি সুবিধা আছে। ম্যানেজাররা স্বল্পমেয়াদে চিন্তাভাবনা করার স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করেন। এক-একটি ম্যাচকে এককভাবে পর্যালোচনা করে এগিয়ে যেতে পারেন তারা। জাতীয় কোচের সেই স্বাচ্ছন্দ্য নেই। জাতীয় পর্যায়ে কোচদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়। তাও আবার অধিকাংশ সময় খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতিতেই। ক্লাব পর্যায়ে খেলার ফলে খেলোয়াড়রা যে দক্ষতা ও বৈশিষ্ট্যগুলো আহরণ করেন সেগুলোর ভিত্তিতেই কৌশল প্রণয়ন করতে হয় কোচদের। নিজস্ব কৌশলগত প্রজ্ঞা খেলোয়াড়দের শৈলীতে প্রভাবিত করার সুযোগ তাদের থাকে না।
এরই সঙ্গে রয়েছে আন্তর্জাতিক ফুটবল পঞ্জিকার সমস্যাটি। এক-একটি প্রতিযোগিতা কিংবা বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব হলে, এক একটি ম্যাচ এতদিন পর অনুষ্ঠিত হয় যে সে সময়ের মধ্যে ক্লাবে পূর্বে ভালো খেলা প্রদর্শন করা খেলোয়াড় বাজে ফর্মে পড়ে যেতে পারেন। তখন ঐ খেলোয়াড়ের ওপর জাতীয় কোচ পরবর্তী ম্যাচের জন্য কতটা ভরসা করতে পারবেন সেটাও এক দুশ্চিন্তার বিষয়।
সেই ধারাবাহিকতায় ক্লাব ম্যানেজার ও জাতীয় দলের কোচের কার্যক্রমে আরেকটি বিশাল পার্থক্যের কথা না বললেই নয়। সেটা হলো কৌশলগত।
ক্লাব ম্যানেজারগণ যেন কোনো তোয়াক্কা ছাড়াই প্রতি ম্যাচে ফরমেশন, কৌশল ইত্যাদি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সক্ষম। যে কোনো ম্যাচে অনভিজ্ঞ তরুণ খেলোয়াড়কে মাঠে নামিয়ে দিতে খুব একটা ভাবতে হয় না তাদের।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সব ম্যাচই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিযোগিতামূলক। তাই জাতীয় দলের কোচদের পক্ষে তরুণ অনভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের নিয়ে এমন পরীক্ষা করাটা খুব সহজ নয়।
ফুটবলে যে কোনো ম্যাচে পরাজিত হওয়া যে কোনো দল ও কোচের জন্য কঠিন। কিন্তু ক্লাব ম্যাচে এ পরাজয়টা যতটা অনায়াসে সহ্য করা যায়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সেটা ততটাই দুঃসহ।
এসব কারণেই জাতীয় দলের কোচদের মূল লক্ষ্য থাকে এমন একদল খেলোয়াড় নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যাদের সমন্বয়ে একটি সুশৃৃঙ্খল, সুস্থির ও অনুপ্রাণিত দল গড়ে তোলা যায়। এর লক্ষ্য অর্জনের পথে দেখা দেয় আরেকটি সমস্যা।
এখন বিশ্বফুটবলে তারকাদের ছড়াছড়ি। অহং, খ্যাতি ও বিশাল সমর্থকগোষ্ঠীর কারণে এসব তারকা খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে প্রভাবও কম নয়। বিশ্বফুটবল কিংবা ফুটবল দলে এমন চরিত্রের আবির্ভাব নতুন কিছু নয়। কিন্তু আধুনিক যুগে তাদের সংখ্যা ও প্রভাবের মাত্রার অস্বাভাবিক ব্যাপ্তি ঘটেছে।
এই বিবরণ সব খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কিন্তু দলে এমন একজনের উপস্থিতি সব ভেস্তে দিতে পারে। ক্লাব পর্যায়েও বিষয়টি প্রভাব ফেলে। কিন্তু সেখানে খেলোয়াড়রা দিনের সীমিত সময়ের জন্য একসঙ্গে থাকে। সমস্যা সৃষ্টিকারী এরকম খেলোয়াড়দের উপস্থিতি অন্য খেলোয়াড় এবং দলের সামগ্রিক মানসিকতার ওপর ততটা প্রভাব ফেলতে পারে না।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ব্যাপারটা একেবারেই ভিন্ন। সেখানে দলের খেলোয়াড়রা কয়েক সপ্তাহ বলতে গেলে দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই একসঙ্গে কাটান। তাদের প্রায় এমন জায়গায় গিয়ে খেলায় অংশগ্রহণ করতে হয় যে দেশ সম্বন্ধে তাদের তেমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ভৌগোলিক পার্থক্যের জন্য ঘুমের সময় ও অন্যান্য নিয়মকানুনে খেলোয়াড়দের ব্যাঘাত ঘটে। প্রতিযোগিতা চলাকালীন কোন খেলোয়াড় কি করছে সেটার ওপর তীক্ষè দৃষ্টি রাখে গণমাধ্যম তথা পুরো বিশ্ব। সে সময় তাদের ব্যক্তিগত অনেক বিষয় নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা উঠে আসে যা তাদের ওপর অন্য এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করতেই পারে। এ রকম সময়ে দলে যদি কেউ সারাক্ষণ তার অহং ও আচরণের জন্য দলের শৃঙ্খলা ও শিষ্টাচার নষ্ট করতে থাকে তাহলে দলের  খেলার ওপর সেটা প্রভাব ফেলবেই।
আর এই কারণেই অনেক জাতীয় দলের কোচ কোনো খেলোয়াড়ের অসাধারণ দক্ষতা ও নৈপুণ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাকে দলে নিতে নারাজ। খেলোয়াড়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও তখন দলীয় কৌশল নিরূপণে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় পরিণত হয়।
এসব কারণেই আমরা জাতীয় দলের কোচদের ক্লাব পর্যায়ে কোনো দলের দায়িত্ব নিতে খুব একটা দেখি না। উল্লেখ্য, যারা এই দায়িত্ব নিয়েছেন তাদের সাফল্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। স্কলারির কথাই ধরুন। বিশ্বকাপ জয়ী কোচ তিনি। ইংলিশ লীগে চেলসির দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। লীগের মাঝ পথেই চাকরি হারাতে হয় তাকে। স্কলারি নিজেও স্বীকার করেছিলেন যে ক্লাব ফুটবলের একজন ম্যানেজারের দায়িত্ব জাতীয় দলে তার অভিজ্ঞতার সঙ্গে একেবারেই বেমানান। চেলসির তৎকালীন দলের খেলোয়াড়রাও বলেন যে, স্কলারির তত্ত্বাবধানে দলের প্রশিক্ষণ, ক্লাব ফুটবলের চিরাচরিত প্রশিক্ষণ বলে মনেই হতো না তাদের। বরং বনভোজনের একটি আমেজ পেতো তারা।
স্কলারির মতো জাঁদরেল কোচ যেখানে ক্লাব ফুটবলের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেননি, তেমনি ক্লাব ফুটবলের ম্যানেজারদের জন্যও জাতীয় দলের চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করা দুরূহ একটি ব্যাপার। হয়তো এটা বুঝেন দেখেই পেপ গার্দিওলা, হোসে মরিনহোদের মতো ম্যানেজারগণ ম্যানেজার তকমা নিয়েই সন্তুষ্ট- জাতীয় দলের কোচ হতে তারাও দ্বিধান্বিত।
বিশ্বকাপে কোন দল হতাশ হয়ে দেশে ফিরবে, কোন দল বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ শিরোপা অর্জন করবে সেটা নির্ভর করছে ১১ জনের ওপর। পুরো দেশ ও জাতির আশ্বাস ও ভরসার ভার বহন করতে হবে এই ১১ জনকে। এদের ওপর সবার দৃষ্টি ও মনোযোগ আটকে থাকবে। সাইডলাইনে দুশ্চিন্তায় পাঁয়চারি করতে থাকা কোচের ওপর তেমন মনোনিবেশ হয়তো করবে না সবাই। মিডফিল্ডার বা রক্ষণভাগ কিংবা ফরওয়ার্ডের মতোই, সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে থাকা সেই কোচের ভূমিকাও দলের সাফল্য বা ব্যর্থতায় কোনো অংশেই কম নয়।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.