স্বরলিপি’র বিদ্যালয়ের শিশুদের বাংলা শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে

Print Friendly and PDF

জা পা ন

রাহমান মনি

বাংলা ভাষা বিশ্বে একমাত্র ভাষা, যে ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ে রাজপথে বুকের তাজা রক্ত দিতে হয়েছে। বর্তমান ৬০০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার এই বিশ্বের প্রায় ২৮ কোটিরও বেশি লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকে। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩.৫ শতাংশ এবং ৬ষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। সূত্র- https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_languages_by_total_number_of_speakers
বাংলাভাষীরা যেখানেই গিয়েছেন, বাংলা ভাষা ধারণ করে রেখেছেন অন্তরে, মনের গহীনে। নিজে যেমন চর্চা চালিয়ে যান, তেমনি প্রবাসে বেড়ে ওঠা নিজ সন্তানসন্ততিদেরও অনুপ্রেরণা জোগান।
জাপানে দিনদিন প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সেই সঙ্গে বেড়ে চলেছে শিশু-কিশোরদের সংখ্যাও। এসব শিশুর কেউবা জাপানেই জন্ম নিয়েছে। আবার, কেউ বাংলাদেশে। তারা বড় হচ্ছে জাপানে।
প্রবাসে শিশুকিশোরদের মাতৃভাষা অর্থাৎ বাংলা ভাষা শেখানো নিয়ে অভিভাবকদের চিন্তার কোনো শেষ নেই। সন্তানদের বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্য শেখানোয় মা-বাবার আগ্রহ থাকলেও বাস্তবায়ন যে সহজ নয় তা সহজেই অনুমেয়। ব্যস্ততম জীবনযাপন, শেখানোর জন্য সুনির্দিষ্ট জায়গার  অভাব, যাতায়াত সময় ও আর্থিক খরচ, শিক্ষক-শিক্ষিকার সংকট। তার অন্যতম কারণ, এখানে যারা শিক্ষক-শিক্ষিকা হয়ে কাজ করে থাকেন তাদের অনেকেই স্বল্প সময়ের জন্য জাপানে অবস্থান করে থাকেন। শারীরিক অসুস্থতা, পারিবারিক ব্যস্ততাসহ অন্য কারণেও শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত, শিক্ষাদানে বিঘœ ঘটা নিত্য নৈমিত্যিক কারণগুলোর অন্যতম।
জাপান প্রবাসীদের দ্বারা পরিচালিত ২টি সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। তার একটি ‘উত্তরণ বাংলাদেশ কালচারাল গ্রুপ জাপান’ যারা নিজেরাই কেবল বাংলা সংস্কৃতি চর্চা করে থাকে। আর, অপরটি হচ্ছে ‘স্বরলিপি কালচারাল একাডেমী টোকিও’। যারা প্রতিষ্ঠিত শিল্পী ছাড়াও শিল্পী তৈরিতে কাজ করে থাকে। জাপানিদের মাঝে বাংলা সংস্কৃতি বিকাশে কাজ করে থাকে।
বিভিন্ন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এই প্রবাসে বাংলা কৃষ্টি সংস্কৃতি তুলে ধরার জন্য পঁচিশ বছর ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছে ‘স্বরলিপি কালচারাল একাডেমী টোকিও’র পরিচালনায় বাংলা শিক্ষা কার্যক্রম। যার শুরু হয়েছিল জাপান প্রবাসী সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুনশী কে. আজাদ এবং রোকেয়া সুলতানা রেণু আজাদ দম্পতির বাসা থেকে। এরপর টোকিওর নিনগিও চো-তে বাংলাদেশের সুহৃদ, বাংলা ভাষা প্রেমী  জাপানি ব্যবসায়ী কেইসুকে নাকাগাওয়া’র (যার সহধর্মিণী ছিলেন একজন বাংলাদেশি) মহানুভবতায় তারই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একটি অংশে স্বরলিপি’র শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু পরবর্তীতে ব্যবসায়িক কারণে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর টোকিওর কিতা সিটি চুউও কোউএন বুনকা সেন্টার-এ কিছুদিন এর কার্যক্রম চলে। এক সময় বিল্ডিং-এর সংস্কার কাজে সেখানেও শিক্ষা কার্যক্রম একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশের সেই মুহূর্তে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. তপন কুমার পাল এবং সংস্কৃতিমনা, প্রকৌশলী তনুশ্রী গোলদার বিশ্বাস এর হাল ধরেন। মুনশী আজাদ এবং রেণু আজাদের অনুপ্রেরণায় এবং তাদের তত্ত্বাবধানে ২০১৩ সাল থেকে কানাগাওয়া প্রদেশের কাওয়াসাকি সিটিতে বহুবিধ শিক্ষামূলক কার্যক্রম আবারও শুরু হয়। প্রথমদিকে নৃত্যকলা দিয়ে বিদ্যালয়টির প্রধান কার্যক্রম শুরু করা হয়।
পরবর্তীতে বাংলাভাষা বাংলাদেশি সংস্কৃতির মূল আকর্ষণ বাংলা ভাষা শেখানোর প্রতি জোর দেয়া হয়। একই সঙ্গে শুরু হয় বাংলা গানের তালীম দেয়া।
তার কারণ, শিশুরা গানের প্রতি আকৃষ্ট সেই আদিকাল থেকেই। গান শিখতে হলে নতুন নতুন শব্দ উচ্চারণ, উৎস এবং প্রয়োগ শিশুদের মনোযোগ আনয়নে সহজতর হয়। তাই, বাংলা ভাষা শেখানোয় এটা একটা কৌশলও বলা যেতে পারে। এই রকম নানা কৌশল অবলম্বন করে আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষাদানে শিশুদের আকৃষ্ট করা হয়।
কাওয়াসাকি এলাকায় পাঠদান শুরু হওয়ার পর গত পাঁচ বছরে স্বরলিপি’র প্রভূত উন্নতি ঘটে। আর এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন ড. তপন কুমার পাল এবং তনুশ্রী গোলদার বিশ্বাস।  চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে স্বরলিপি’র বাংলা সংস্কৃতি চর্চা বিদ্যালয়ের সুনাম।
নিজস্ব আয়োজন ছাড়াও বিভিন্ন বড় বড় আয়োজনে স্বরলিপি’র শিক্ষার্থীদের ডাক পড়তে থাকে তাদের প্রতিভা প্রদর্শন করার জন্য। তাতে শিশু শিক্ষার্থীদের প্রতিভা প্রকাশের পাশাপাশি জাপানের মাটিতে বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। এর মধ্যে গ্লোবাল পিচ ফাউন্ডেশন জাপান অন্যতম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গ্লোবাল পিচ ফাউন্ডেশন অংশ নিয়ে স্বরলিপি সকলের মন জয় করতে সক্ষম হয়। গ্লোবাল পিচ ফাউন্ডেশন জাপানের প্রতিটি আয়োজনে স্বরলিপি’র অংশগ্রহণ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।
উল্লেখ্য, গ্লোবাল পিচ ফাউন্ডেশন জাপানের ভাইস প্রেসিডেন্ট একজন বাংলাদেশি। সাপ্তাহিক জাপান প্রতিনিধি রাহমান মনি।
 টোকিও বৈশাখী মেলা, বাংলাদেশ দূতাবাসের আয়োজনে স্বরলিপি’র শিশু-কিশোররা অংশ নিয়ে নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয়সহ সব বিভাগেই প্রতিভার স্বাক্ষর রাখে। জাপানের মাটিতে বাংলা সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়। আর এর পেছনে অনন্য ভূমিকা পালন করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। গত পাঁচ বছরে যে শিক্ষক-শিক্ষিকারা অবদান রেখেছেন বা রেখে চলেছেন তারা হচ্ছেন বাংলা ভাষা শিক্ষায়  মুনশী কে. আজাদ, রেণু আজাদ, ড. তপন কুমার পাল, বনানী পাল, কাকলী পাল, তনুশ্রী গোলদার বিশ্বাস। নৃত্যকলায় বাবলী ইসলাম কলি, প্রিয়াংকা রায় মিত্র পিংকি, সংজ্ঞা ঘোষ, আর বাংলা গানের জন্য মিতালী ঘোষ প্রমুখ। এ সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা শিশুতোষ বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে সঠিক বাংলা সংস্কৃতি শিক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছেন।
বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষা বিভাগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে রয়েছে কাব্যজ্যোতি বিশ্বাস, নাওমি খান, কথাশ্রী বিশ্বাস, ইয়ুতো কুদ্দুস, শৌর্য দত্ত, ভাগ্যশ্রী পাল, প্রগতি ঘোষ, ইয়ুকি কুদ্দুস, সৃজিতা বিশ্বাস, খান মোহাম্মদ আকিদ, সম্প্রীতি ঘোষ, আদিত্য সাহা, শ্রেয়া পাল এবং শ্যামল গোমেজ। এছাড়াও অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা নেহায়েতই কম নয়।
মুনশী কে. আজাদ এবং রেণু আজাদ পাঠদান ছাড়া পৃষ্ঠপোষকতাও করে থাকেন একইসঙ্গে। এছাড়াও পৃষ্ঠপোষকতা করেন স্বরলিপি’র অধ্যক্ষ এমডি নাসিরুল হাকিম এবং অন্য শুভানুধ্যায়ীরা।
বিদ্যালয়ের কার্যক্রমকে উৎসাহিত করার জন্য টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস সকল শিক্ষার্থীকে পাঠ্যবই প্রদান করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা দূতাবাসের পক্ষে এ ইচ্ছা পোষণ করেন বলে স্বরলিপি থেকে জানা যায়।
বর্তমানে  বাংলাদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে দূতাবাস থেকে বই আসার কার্যক্রমটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষায় উৎসাহিত করার জন্য বছরে একাধিকবার (প্রতি চার মাস অন্তর) আয়োজন করা হয় বনভোজনের। বনভোজন নাম হলেও বিভিন্ন উদ্যান বা স্থানীয় সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র ভাড়া নিয়ে জাপানে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের বাংলাদেশে খাদ্য সংস্কৃতি, পোশাক সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করানো হয়। আয়োজন থাকে বিভিন্ন বিনোদনের। শুধু শিশু-কিশোরদের জন্যই যে বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে তা কিন্তু নয়, থাকে তাদের অভিভাবক এবং অংশ নেয়া সকলের জন্যও।
এ বিনোদনমূলক খেলাগুলোর মধ্যে বিংগো গেইম, মিউজিক্যাল পিলো, শিশুকিশোরদের বাণ নিক্ষেপ বা বাণ খেলা (ডার্টস) প্রধান। প্রদর্শন করা হয় শিক্ষার্থীদের প্রোগ্রেস।
তেমনি একটি আয়োজন ছিল ৮ জুলাই ২০১৮ কানাগাওয়া প্রদেশের কাওয়াসাকি সিটির নাকাহারা শিমিন কান এর নাকাহারা সিভিক হল এ। চতুরমাসিক এ আয়োজনে  শিক্ষামূলক  অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিনোদনমূলক বিভিন্ন আয়োজনে শিশুকিশোররা বড়দের সাথে দিনভর হৈ হল্লায় মেতে উঠে ।
শিশুকিশোরদের বাণ নিক্ষেপ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে ভাগ্যশ্রী পাল তিথী, যৌথ ভাবে ইয়ুতো কুদ্দুস এবং ইয়ুকি কুদ্দুস (তারা দুই ভাইবোন) দ্বিতীয় স্থান এবং আরুশ তৃতীয় স্থান অধিকার করে।
  বিংগো গেইম এ সংজ্ঞা ঘোষ, মিতালী ঘোষ এবং বনানী পাল যথাক্রমে ১ম, ২য় এবং ৩য় স্থান অধিকার করেন।
   মিউজিক্যাল পিলো খেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেন উজ্জ্বল কুমার পাল, দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন তানভিন হাকিম, তৃতীয়  স্থান অধিকার করেন কাব্যজ্যোতি বিশ্বাস বাঁধন।
শিশুকিশোরদের বাংলা সংস্কৃতি শিখানোতে স্বরলিপি’র মাঝে মধ্যেই হোঁচট খেতে হয়েছে, হচ্ছে। তারপরও তাদের প্রাণান্তর চেষ্টা থেমে যায়নি। এগিয়ে চলেছে।
আর এই প্রাণান্তর চেষ্টা চালিয়ে যেতে সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন, তা হচ্ছে অভিভাবকদের আন্তরিক সহযোগিতা। শত ব্যস্ততার মাঝেও তারা যদি অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের নিয়মিতভাবে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত রাখতে পারেন তাহলেই কেবল উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ সাফল্যের মুখ দেখতে পাবে। প্রবাসী শিশুকিশোররা বাংলা সংস্কৃতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে জাপানে মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা চির উন্নত রাখবে।
তবে, বর্তমানে জাপানে যে হারে সংগঠন বেড়েছে তাতে করে স্বরলিপি’র এমন মহতী উদ্যোগ কতোটা আলোর মুখ দেখতে পারবে তা সময়ই বলে দিবে। আর এই আশঙ্কার অন্যতম কারণ হচ্ছে, সংগঠন বাড়ার কারণে একদিকে যেমন সাংগঠনিক আয়োজনের সংখ্যা বেড়েছে, তেমনি পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেও পারিবারিক আয়োজনের সংখ্যাও বেড়ে গেছে বহুলাংশে।
 আর পারিবারিক আয়োজন মানেই পরিবারের সকল সদস্যের অংশগ্রহণ। বিশেষ করে শিশুকিশোরদের, তাদের অভিভাবকদের সাথে।
বিবাহ বার্ষিকী, জন্মদিন পালন, বেবি শাওয়ার, বিভিন্ন উছিলায় ‘গেট টুগেদার’ পারিবারিক আয়োজনগুলোর অন্যতম। আর এই সব আয়োজনে সাধারণত পরিবারের সকলেই অংশ নিয়ে থাকেন। যেই অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে বাংলা সংস্কৃতি শিক্ষা চর্চা কেন্দ্রে  আসবেন, সেই অভিভাবকরাই  সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা এবং নিজেদের বিনোদনের জন্য সন্তানদের নিয়ে বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নিয়ে থাকেন। আর এইভাবেই  শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির সংখ্যাও হ্রাস পায়।
সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও  তথ্য সহযোগিতায় ড. তপন কুমার পাল।
rahmanmoni@kym.biglobe.ne.jp

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রবাসে
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.