জাপানে কর্মসংস্থান : বড় সুযোগ হারাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ? - আনিস রায়হান

Print Friendly and PDF

মাত্র বছর তিনেক আগের কথা, ২০১৫ সালের আগস্ট। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সূত্রে জানা গেল, বাংলাদেশ থেকে কর্মসংস্থানের দরজা খুলে দিচ্ছে জাপান। ২০১৯ সালের রাগবি বিশ্বকাপ, ২০২০ সালে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক, প্যারা অলিম্পিক ও ২০২২ সালে শীতকালীন অলিম্পিকের আয়োজক দেশ হওয়া, নিজ দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং নতুন যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাপক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়ার কারণে বিপুল শ্রমিকের অভাব বোধ করছে এশিয়ার উন্নত দেশটি। এতদিন প্রধানত চীন থেকেই তারা দক্ষ জনবলের জোগান পেত। কিন্তু স্থানীয় চাহিদার কারণে ইদানীং চীন সরকার বিদেশে শ্রমিক প্রেরণে অনুৎসাহ দিচ্ছে এবং চীনা শ্রমিকরা বিদেশে বেতনও বেশি দাবি করছে। ফলে জাপান এখন শ্রমিক সংস্থানের জন্য নতুন বাজারের দিকে চোখ রাখছে। প্রাথমিকভাবে যে সাতটি দেশ থেকে জনশক্তি আমদানির ব্যাপারে জাপান সরকারের সবুজ সংকেত মেলে তার মধ্যে বাংলাদেশের পাশাপাশি ছিল ভারত, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া।
বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব খন্দকার ইফতেখার হায়দার সে সময় জানান, বাংলাদেশ থেকে জাপান যে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক নিতে আগ্রহী, সেই সংখ্যাটা মোটেও ১০ হাজারের নিচে নয়। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে জাপানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে খোলা হয় একটি শ্রম শাখা। জাপান সরকারও অলিম্পিক ও প্যারা অলিম্পিক আয়োজনে নির্মাণ পরিকল্পনায় বিদেশি শ্রমিক নেয়ার ব্যাপারে ফরেন কন্সট্রাকশন ওয়ার্কার একসেপটেন্স প্রোগ্রাম নামের একটি কর্মসূচিও হাতে নেয়। পাশাপাশি গ্রেট ইস্ট সুনামি ডিভাসস্টেটেড এরিয়া পুনর্নির্মাণে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন ট্রেনিং প্রোগ্রাম (টিআইটিপি) কর্মসূচি গ্রহণ করে। এ দুটি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ সময় জাপানের আন্তর্জাতিক জনশক্তি উন্নয়ন সংস্থার (আইএম, জাপান) সঙ্গে বেশকিছু সমঝোতা ও চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। এসব সমঝোতা ও চুক্তির আওতায় জাপানে বাংলাদেশিদের কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত হয়। আগে মাত্র ৩০টি পেশায় বাংলাদেশিরা চাকরি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলেও এই পর্যায়ে সব মিলিয়ে ৭৭টি পেশাকে বাংলাদেশিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।
জাপানে কর্মসংস্থানের দরজা খুলে যাওয়াটাকে সরকার পক্ষ বিরাট অর্জন হিসেবে চিহ্নিত করে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের চেয়ে জাপানে আয়ের সুযোগ বেশি, আর সেখানকার কর্মপরিবেশও স্থিতিশীল। মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে শ্রমিকরা ক্ষতিকর উগ্র মতাদর্শের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও জাপানে সেটা একেবারেই সীমিত। তাছাড়া এটা ছিল জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কোন্নয়নের নতুন একটি সুযোগও। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগেনি। ৩ অক্টোবর ২০১৫ দেশের মাটিতে জাপানি নাগরিক কুনি হোশিও হত্যার পর চিত্রপট একেবারেই পাল্টে যায়। বাংলাদেশ ভ্রমণে বিশেষ সতর্কতা জারি করে জাপান সরকার। স্তিমিত হয়ে আসে জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রম। কিন্তু এই পরিস্থিতির আঁচ কাটিয়ে উঠতে না উঠতে মাত্র ৯ মাসের মাথায় জাপান বাংলাদেশ সম্পর্কে নেমে আসে আরও বড় এক কালো অধ্যায়।
১ জুলাই ২০১৬ হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় অন্যদের পাশাপাশি নিহত হন জাপানের সাত নাগরিক। এরপর থেকে অনেক জাপানির কাছে বাংলাদেশ হয়ে যায় ‘আইএস আক্রান্ত রাষ্ট্র’। জাপান সরকার প্রকাশ্যে এমন কোনো বিবৃতি না দিলেও সেখানকার কর্মকর্তা, কর্মচারী, এমনকি সে দেশের ওয়াকিবহাল জনগণও মনে করে ওই হামলা আইএস দ্বারাই পরিচালিত হয়েছে এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে আইএসের বীজ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই জাপানিদের বাংলাদেশ ভ্রমণে আরও কড়াকড়ি আরোপ হতে থাকে। জাপান সরকার বাংলাদেশগামী জাপানিদের পরামর্শ দেয়ার জন্য বিশেষ শাখা গঠন করে। এমনকি সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় গঠিত বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার আকার দ্বিগুণের পরিকল্পনা নেয় জাপান। এভাবে জাপানে বাংলাদেশ হয়ে ওঠে একটি বিশেষ নাম, যে নামের সঙ্গে আতঙ্কের সম্পর্ক আছে।
 
২.
হোলি আর্টিজান হামলার পর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ। জঙ্গি সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত পথ নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা থাকলেও জঙ্গি গ্রুপগুলোকে দমন করার ক্ষেত্রে সরকার যে সাফল্য পেয়েছে, তা কেউ অস্বীকার করে না। পাকিস্তান বা ফিলিপাইনের মতো দেশ যেভাবে জঙ্গি সমস্যায় কাবু হয়েছে, বাংলাদেশকে সেই পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। ফলত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা সতর্কতা ও বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কিন্তু জাপানের ঐতিহ্যবাহী রক্ষণশীলতার জয় হয়েছে। বাংলাদেশ এখনও তাদের কাছে রয়েছে লেভেল-টু সতর্কতাভুক্ত রাষ্ট্রের তালিকায়। অর্থাৎ জাপান এখন পর্যন্ত তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ সফরের ক্ষেত্রে তুলনামূলক উচ্চ মাত্রার পরামর্শমূলক সতর্কতা বজায় রেখে চলেছে।
বাংলাদেশ সরকার চাইছে এই পরিস্থিতি দ্রুত কাটিয়ে উঠতে। এজন্য রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করে চলেছে। এ বছরের মে মাসের মাঝামাঝি জাপান সফর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। এর বিপরীতে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো ৭ আগস্ট ২০১৮ ঢাকা সফর করেন। সরকার বলছে, আলোচনা হচ্ছে। আর ফলও আশাপ্রদ। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, ‘আমরা জাপানের কাছে দাবি জানিয়েছি ভ্রমণ সতর্কতা তুলে নেয়ার, তারা রাজি হয়েছে। তাদের নিয়ম অনুযায়ী এটা হতে আরও কিছু সময় লেগে যেতে পারে। কিন্তু সেজন্য যে সব কিছু আটকে আছে, এমন নয়। দুই দেশের মধ্যে ইতোমধ্যে নানা ধরনের চুক্তি হয়েছে। এ বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ বৈদেশিক কল্যাণ ও প্রবাসী কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এসব চুক্তির আওতায় জাপানে নতুন লোক যাচ্ছে, আরও যাবে।’
মন্ত্রীর তদারকিতে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, এ বছরের জুলাই মাসে জাপানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস বাংলার ইতিহাস- ঐতিহ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং পর্যটন সম্পর্কে জাপানি নাগরিকদের অবহিত করা ও তাদের বাংলাদেশে ভ্রমণে আগ্রহী করার অভিপ্রায়ে নানা কর্মসূচি আয়োজন করেছে। সরকারের এরকম নানা আয়োজনের ফলেই জাপান থেকে ইতিবাচক সাড়া মিলছে। ২৭ আগস্ট, ২০১৮ বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডকে ২৪টি উদ্ধারকারী বোট ও যন্ত্রপাতি প্রদানের জন্য বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের মধ্যে ২১১ কোটি ৭৪ লাখ টাকার অনুদান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্কেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জাপান থেকে ৩ কোটি ১৪ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৩৭ শতাংশ বেশি। এক বছর আগে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ কোটি ২৮ লাখ মার্কিন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ মার্কিন ডলার।
জাপান বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মী নিয়োগ দেয়াও শুরু করেছে। টেকনিক্যাল ইন্টার্ন প্রেরণের লক্ষ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং আইএম জাপানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছিল এ বছরের মার্চে। তারই ধারাবাহিকতায় খুব কম সময়ের মধ্যে প্রথম ব্যাচ চলে গেছে। আরও কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে, অচিরেই এরাও যেতে পারবে। কেয়ার গিভার বা শুশ্রƒষাকারী হিসেবে প্রথমবারের মতো জাপান যাচ্ছে বাংলাদেশের নারীরা। দেশের বিভিন্ন স্থানের ৭ জন নারী ইতোমধ্যে জাপানে যাবার জন্য চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। বাংলাদেশ-জার্মান টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে (বিজিটিটিসি) এই প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এদের কাউকে কোনো অভিবাসন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে না। এমনকি তাদের বিমান ভাড়াও প্রদান করতে হচ্ছে না। জাপানে কোম্পানিভেদে এদের আয় ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা করে হবে।
৬ আগস্ট ২০১৮ জাপানের বৃহত্তম এবং বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সিগারেট নির্মাতা জাপান টোব্যাকো ১৫০ কোটি ডলার বা ১২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা দিয়ে বাংলাদেশের আকিজ গ্রুপের সিগারেট তৈরির সব ব্যবসা কিনে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এটা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক কোনো বৈদেশিক বিনিয়োগ। আকিজ গ্রুপের সঙ্গে জাপান টোব্যাকোর চুক্তির বিষয়টিকে সরকার দেখছে বিরাট অগ্রগতি হিসেবে। মন্ত্রী বলেন, ‘যেভাবে সবকিছু এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ওই সতর্কতা তারা প্রত্যাহার করে নেবে, আর জাপানে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নতুন নতুন আরও অনেক পথ খুলে যাবে।’
 
৩.

পত্র-পত্রিকা ঘাঁটলে দেখা যায়, জাপানের আরোপিত সতর্কতা দ্রুতই উঠে যাওয়ার বিষয়ে সরকার অনেক আগে থেকেই আশাবাদী। কিন্তু সেই অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না। ২০১৭ সালেই সরকারের কর্তারা ব্যাপক আত্মবিশ্বাসের সুরে দাবি করেন যে, জাপান এই সতর্কতা উঠয়ে নিতে যাচ্ছে। কিন্তু এই আগস্ট মাসের সফরেও জাপানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানালেন, বাংলাদেশে থাকা জাপানি নাগরিক এবং দেশটির বিনিয়োগের সুরক্ষাই জাপানের অগ্রাধিকার। যার অর্থ দাঁড়ায়, বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে বলে মনে করে না জাপান। সরকার এই বিবাদ যে এখনও ভঞ্জন করতে পারেনি, এটা সমস্যাজনক।
জাপান সরকারের আরোপিত ভ্রমণ সতর্কতা দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও সংহত করার ক্ষেত্রে বড় একটি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা জাপানি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এড়ায়নি। কিন্তু ভ্রমণ সতর্কতার কারণে তারা বিনিয়োগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পিছিয়ে যাচ্ছেন। বাজার যাচাইয়ের সুযোগ তাদের মিলছে না।
জাপানে উন্নয়ন কর্মকা-, নতুন নির্মাণযজ্ঞ ও খালি হতে থাকা শ্রমিকের আসন পূরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি শ্রমিকরা আকর্ষণীয়। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, দক্ষ আইটি কর্মী, টেকনিক্যাল হেলপার, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকর্মী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী এবং টেক্সটাইল ও জাহাজ শিল্পে বাংলাদেশ থেকে লোক নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহী জাপানের জনশক্তি আমদানিকারকরা। কিন্তু বাংলাদেশে আইএস আছে বা এখানকার মানুষ আনা হলে আইএসের বীজ ছড়িয়ে পড়তে পারে, সন্ত্রাসী হামলার সুযোগ বেড়ে যেতে পারে, এমন সব আশঙ্কাই জাপানে বাংলাদেশিদের সুযোগগুলো বিনষ্ট করছে। বাংলাদেশ সরকার যদিও নানামুখী উদ্যোগের কথা বলছে, কিন্তু সেসব উদ্যোগ যে ঠিকঠাক কাজ করছে না, দ্রুত যে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো দরকার, সেটা তারা ঠাহর করতে পারছে না।
এর মধ্যেই জাপান থেকে একটি গবেষক দল বাংলাদেশে এসে হাজির হয়েছে। টোকিওর মানবাধিকার সংগঠন এশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটি (এপিএফএস) এবং রিক্কিয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে বৈশ্বিক অভিবাসন, বহুজাতিক নেটওয়ার্ক এবং জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ক এক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। যেসব বাংলাদেশি কর্মী এক সময় জাপানে ছিলেন, পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় বা আইনগত জটিলতায় ফিরে এসেছেন, গবেষকরা তাদের সঙ্গে কাজ করছেন। টোকিওভিত্তিক রিক্কিয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সমাজবিজ্ঞানী ড. মিজুকামি তেতসুও’র সঙ্গে এই গবেষণা বিষয়ে কথা বলি আমরা। তিনি জানান, ‘বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তিটা শক্ত হলেও বাস্তবে এই সম্পর্ক খুবই দুর্বল। যদিও আমরা এশীয় দেশ, কিন্তু আমাদের মধ্যে সেরকম লেনদেন নেই। অধিকাংশ জাপানি বাংলাদেশ সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। যা জানে সেটা নেতিবাচক, পশ্চিমা ধ্যান-ধারণার অনুকূল। আমাদের এই গবেষণার একটি কাজ হলো বাংলাদেশকে জানা। আমাদের উদ্দেশ্য হলো, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কটাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।’
তিনি বলেন, ‘হোলি আর্টিজান হামলার পর জাপানে বাংলাদেশ সম্পর্কে যে ভীতি সৃষ্টি হয়েছে, এখানে এসে আমার মনে হয়েছে তা অমূলক। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এবং জাপান সরকার উভয়ই এক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তারা কেউই জাপানের জনগণের কাছে বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে পারেনি। জাপানে তো এখন রাজনৈতিকভাবে খারাপ সময় যাচ্ছে। সরকারের নেতারা উগ্র জাতীয়তাবাদী। ফলে তাদের কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু প্রত্যাশা করতে পারি না। কিন্তু বাংলাদেশের এক্ষেত্রে জোর ভূমিকা নেয়াটা উচিত ছিল।’ এই সমাজবিদ আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ‘আমরা জাপানের অভিবাসন প্রক্রিয়াকে উন্নত করতে চাইছি। আমাদের এই গবেষণা সেক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এতে বাংলাদেশসহ অনুন্নত দেশগুলোর জনগণ এবং জাপানও লাভবান হতে পারবে।’
 
৪.
অনলাইনে চাকরির খোঁজ দেয়া প্রতিষ্ঠান বিডিজবস ডটকম ২৩ আগস্ট ২০১৮ টোকিওভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জাপান জব অ্যান্ড ভিসা সার্ভিস করপোরেশনের বরাতে একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ থেকে নির্মাণ খাতের শ্রমিক সংগ্রহ করছে এই পন্থায়। অথচ এটা হওয়ার কথা ছিল সরকারের তদারকিতে। সরকার সবক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও জাপানে জনশক্তি প্রেরণের প্রশ্ন তুললে অচিরেই সব সমস্যা মিটে যাওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন তারা। অথচ ২০১৫ সাল থেকে জাপান জনশক্তি আমদানির পরিকল্পনা করছে। তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিশ্চয়ই বাংলাদেশের জন্য বসে নেই।
ইতোমধ্যে ২০১৮ সাল যেতে বসেছে। জাপানে অলিম্পিক আয়োজনের আর খুব বাকি নেই। এর মধ্যে যে সীমিত সুযোগ পাওয়া যায়, সেটাকে কাজে লাগাতে হলে দরকার জোর কূটনৈতিক তৎপরতা। জাপান থেকে যেমন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এসে গবেষণা চালাচ্ছে, সরকারের উচিত তেমনি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান দিয়ে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করানো এবং সেই প্রতিবেদন জাপানসহ বিশ্বের সামনে তুলে ধরা। হাতে সময় খুবই অল্প। এই সময়টা কাজে না লাগাতে পারলে বিরাট সুযোগ নষ্ট হবে। দক্ষ, দায়িত্বশীল ও উদ্যোগীদের সমন্বয়ে বিশেষ দল গঠন করে এই সংকট সমাধানের দায়িত্ব দেয়া উচিত। দেশের বাইরে থাকা প্রবাসী ও আন্তরিক কূটনীতিকদেরও এর সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। স্বাধীন গবেষকদেরও বাদ দেয়া নয়। মোটকথা সব সুযোগই কাজে লাগানো উচিত। এই সুযোগ হেলায় হারালে দেশের ক্ষতিটাও হবে অপূরণীয়।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

এই সময়/রাজনীতি
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.