‘রাজনীতির বিভাজন সমাজের সর্বনাশ ঘটিয়েছে’-ড. আকবর আলি খান

Print Friendly and PDF

ড. আকবর আলি খান। অর্থনীতিবিদ। গবেষণা করছেন সমাজ, রাজনীতি এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব। অধ্যাপনা করছেন বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে মুখোমুখি হন সাপ্তাহিক-এর। আলোচনায় ওঠে আসে রাজনীতির চলমান সংকট ও অন্যান্য প্রসঙ্গ। গণতন্ত্রের উন্নয়নে আনুপাতিক হারে নির্বাচনের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ উভয় দেশের জন্য অশুভ বলে মত দেন।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

সাপ্তাহিক : ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সংকট নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে হতাশা প্রকাশ করেছিলেন। ৫ বছর পর ফের নির্বাচন আসছে। এখন কী বলবেন।  
ড. আকবর আলি খান : ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন ঘিরে রাজনীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা কেটে যায়নি বরং ওই নির্বাচন ঘিরে সংকট আরও ঘনীভূত করেছে।
সাপ্তাহিক : এই ধারণা কি গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে?
ড. আকবর আলি খান : বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দরকার আছে। গণতান্ত্রিক আদর্শের ভিত্তিতেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা।
কিন্তু গণতন্ত্র তো হোঁচট খেলো। যে রাষ্ট্রে কার্যকর কোনো বিরোধী দল নেই, সেই রাষ্ট্রে গণতন্ত্র বিধান হতে পারে মাত্র, কিন্তু এর কোনো রূপায়ণ নেই। সুতরাং যে পরিস্থিতির মধ্যে আছি, সেটাকে ঠিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ বলা চলে না।
আমরা সবাই চাই, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠা পাক, কিন্তু সেটা হবে কিনা, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না।
সাপ্তাহিক : একবারেই অনিশ্চিত বলছেন? নিশ্চয়তার কোনো আশা থাকতে পারে না?
ড. আকবর আলি খান : যদি রাজনৈতিক দলগুলো একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহযোগিতা করে, তাহলে অনেক পরিবর্তনই আসতে পারে। কিন্তু এই ধরনের সহযোগিতার কোনো আভাস আমরা দেখতে পাচ্ছি  না। সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নেই। তবে একবারেই নেই, তা বলছি না।
সাপ্তাহিক : আমরা উন্নয়নের কথা বলছি, এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছি। তবুও স্বাধীনতার অর্ধশত বছরে আমাদের শাসন ব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা শুনতে হচ্ছে।
ড. আকবর আলি খান : এই বাস্তবতা অস্বীকার করার তো জো নেই। গণতন্ত্র থেকে আমরা অনেক দূরে সরে এসেছি, এটি দিবালোকের মতো সত্য। বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতির পরিবর্তন চাইছে মানুষ। তার মানে দেশে আদর্শিক গণতন্ত্র নেই।
সাপ্তাহিক : আজকের যে পরিস্থিতি, এর জন্য কোন কারণকে সামনে আনবেন?
ড. আকবর আলি খান : গণতন্ত্রহীন এই পরিস্থিতির জন্য অনেক কারণই আছে। ঐতিহাসিক, ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিবার, বংশগত রাজনীতি, ক্ষমতায় এসে আইনের শাসন প্রতিপালন না করার মতো বহু কারণ আছে। বাংলাদেশে আজকের পরিস্থিতির জন্য কোন কোন বিষয় দায়ী, তার ওপরে আমি বই লিখেছি।
সাপ্তাহিক : তার মানে বাঙালি এখনও বাঙালিকে শাসন করতে শিখল না?
ড. আকবর আলি খান : আমি ঠিক এভাবে মনে করি না। বাঙালি বাঙালিকে শাসন করতে পেরেছে। ইতিহাসে আছে, কঠিন সময়ে বাঙালি বজ্রকঠিন ঐক্য করেছে। তবে তা হয়তো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দীর্ঘস্থায়ী ঐক্যের মাধ্যমে দেশ শাসন করতে হলে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। তবে তা কতদিন অপেক্ষা করতে হবে, তা সময় ধরে বলা যাবে না।
সাপ্তাহিক : এমন অপেক্ষার মধ্যেও কি সমাধানের পথ নিয়ে কথা বলা যেতে পারে? নাকি রক্তপাত...  
ড. আকবর আলি খান : রক্তপাতের ঘটনাও ঘটতে পারে। আবার অন্যভাবেও সমাধান আসতে পারে। রক্তের দাগ তো আমরা রাজনীতিতে দেখেছি।
এ নিয়ে আমার দুই ধরনের মত আছে। বর্তমান সংবিধানের আলোকে সমাধান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। যদি সাংবিধানিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয়, তাহলে সমাধান তাড়াতাড়ি হতে পারে।
সাপ্তাহিক : সাংবিধানিক কাঠামোর পরিবর্তনটা কী হতে পারে?
ড. আকবর আলি খান : নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে ক্ষমতার বণ্টন। এর জন্য সংবিধানের পরিবর্তন জরুরি। রেফারেন্ডাম ব্যবস্থার প্রবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে এখানে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশনে অনেক সংস্কারের দরকার আছে বলে আমি মনে করি।
সাপ্তাহিক : বারবার ঠেকতে হচ্ছে। ঠেকেও কেন আমরা সমাধানের পথে হাঁটতে পারছি না?
ড. আকবর আলি খান :  সমাধানের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর আগ্রহ নেই। হতাশার কথা মূলত এখানেই। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সাংবিধানিক কাঠামো পরিবর্তনের কথা বলতেন তাহলে হতাশা কেটে যেত। কিন্তু রাজনৈতিক দলেরই এ নিয়ে উৎসাহ নেই।
আনুপাতিক হারে যদি নির্বাচন হয়, তাহলে দেখা যাবে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দলই নিরঙ্কুশ বিজয় পাবে না। আনুপাতিক হারে নির্বাচন হলে সমঝোতা হবে, স্বেচ্ছাচারিতা কমে আসবে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি অনুধাবন করতে পারে যে, পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতা করতে না পারলে ক্ষমতায় আসা যাবে না, তাহলে হিংসা-বিদ্বেষ অনেক কমে আসবে।
আনুপাতিক হারে নির্বাচন হলে রাজনীতিতে যে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি, তারও বড় একটি পরিবর্তন ঘটবে।
সাপ্তাহিক : তার মানে নিরঙ্কুশ বিজয়ই আজকের সংকটের জন্য অন্যতম কারণ?
ড. আকবর আলি খান : যারা ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসছে, তারা কেউই ৫১ শতাংশের বেশি ভোট পায় না। ৪০ কি ৪২ শতাংশ ভোট পেয়েই ক্ষমতায় আসছে। ভারতেও তাই। মোদি সরকার ৩৩ শতাংশ ভোট নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এ কারণেই আমি মনে করি ভোটের আনুপাতিক হার নিয়ে পর্যালোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।
মাত্র একটি ভোটের ব্যবধানে জিতলেই সংসদে আসা যায়, এমন ধারণা থেকেই জালিয়াতি বেশি হয়। আনুপাতিক হারে নির্বাচন হলে পরস্পরের প্রতি হিংস্রতা কমে যাবে এবং জাল-জালিয়াতি কমে যায়।
সাপ্তাহিক : আনুপাতিক হারের নির্বাচনের বিষয়টি যদি সংক্ষিপ্তভাবে ব্যাখ্যা করতেন?
ড. আকবর আলি খান : নির্বাচনে যারা যত শতাংশ ভোট পাবে তারা সেই অনুপাতে সংসদে আসবে। অনেক দেশেই আবার মিশ্র ব্যবস্থাও আছে। কিছু আসনে আনুপাতিক হারে আবার কিছু আসনে সরাসরি ভোটে নির্বাচন হয়। এর মাধ্যমেও ব্যালেন্স আসে ক্ষমতায়। বাংলাদেশেও আপাতত এমন মিশ্র ব্যবস্থা আসতে পারে। তবে তাৎক্ষণিক সুফল পেতে হলে অর্থাৎ গণতন্ত্র ধারা প্রতিষ্ঠা করতে হলে পূর্ণ আনুপাতিক হারে নির্বাচন দিতে হবে।
কিন্তু বাংলাদেশে এই ধারা প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো কোনোভাবেই চাইবে না দেশে আনুপাতিক হারের নির্বাচন প্রবর্তন। তারা চায় যে কোনো উপায়ে জিততে পারলেই ৫ বছরের জন্য ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা যাবে।
আমি বলে আসছি, বাংলাদেশের ভোটাররা একদিনের বাদশা। ভোটের দিন প্রতিনিধিরা গিয়ে ভোটারদের তোষামোদ করে থাকেন। ভোট হয়ে গেলে ভোটারদের আর দাম থাকে না।
সাপ্তাহিক : রাষ্ট্র, সমাজে পরিবর্তনও তো হলো। কিন্তু ভোট এবং গণতন্ত্রের নামে শোষণের হাত শক্তিশালীই থেকে গেল।
ড. আকবর আলি খান : পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল এথেন্সে। এথেন্সের গণতন্ত্রেরও অনেক দোষ ছিল। সব নাগরিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারতেন না। অল্প সংখ্যক নাগরিক ভোট দিতেন। তবুও সেটা ছিল সরাসরি গণতন্ত্র। ভোটারদের সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন হতো।
ভোটার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণেই পরোক্ষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছে পৃথিবীতে। এ কারণেই ভোটারদের অধিকার রাখতে আনুপাতিক হারে নির্বাচন হয়ে আসছে অনেক দেশে। ইউরোপের অনেক দেশেই একাধিকবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের জন্য।
সাপ্তাহিক : চলমান সংকট উত্তরণে আপনার মত কী?
ড. আকবর আলি খান : সমাধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে। জনগণ কী চায়, তাও জানে রাজনৈতিক নেতারা। তারা আলোচনায় বসলেই সমাধানের পথ বেরিয়ে আসবে। মুশকিল হচ্ছে তারা বসবে না। আলোচনায় না বসে একে অপরকে দোষ দিতে অভ্যস্ত আমাদের নেতারা।
দলের শীর্ষ নেতৃত্বও একে অপরকে গালিগালাজ করে আসছে। আমি বহুবার বলেছি, লিখেছি গালিগালাজ বন্ধ করে ভদ্র ভাষায় অন্তত একে অপরের সমালোচনা করেন, তাহলেও কিছুটা হিংসা দূর হতো। নেতারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে বলেই কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সাপ্তাহিক : এই উত্তেজনা সমাজের জন্য কতটুকু ক্ষতি করল?
ড. আকবর আলি খান : রাজনীতির বিভাজন সমাজের সর্বনাশ ঘটিয়েছে। এই রাজনীতি ভালো লোকের জায়গা সঙ্কুচিত করে দিচ্ছে আর খারাপ লোকগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে। মানুষ রাষ্ট্র, সমাজের মূল দায়িত্ব থেকে দূরে সরে পড়ছে। আর অযোগ্যরা ক্ষমতা দখল করছে।
এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে হলে রাজনীতির পরিবর্তন জরুরি। পরিবর্তন অসম্ভব না। হানাহানি চলতে থাকলে দলগুলোর মধ্যেও চিন্তার পরিবর্তন আসতে পারে। সমস্যার সমাধান নিয়ে যখন তাদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেবে তখনই আমরা মুক্তির পথ পাবো।  
একে অপরের প্রতি অসহনশীল হওয়ার প্রবণতা বড় দুই দলের মধ্যেই আছে। আওয়ামী লীগ এখন যে ভাষায় কথা বলছে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে একই ভাষায় কথা বলেছে। সরকারি দলে থাকলে আচরণ এবং ভাষা বদলে যায়। বিএনপির এখন যে নমনীয় চেহারা তা ক্ষমতায় গেলে থাকবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ বিএনপির অতীতও এদেশের মানুষ জানে।
সাপ্তাহিক : সাধারণ মানুষের প্রতি ভরসা রাখছেন কতটুকু? মুক্তি পেতে সাধারণ মানুষ কি ঘুরে দাঁড়াতে পারে?
ড. আকবর আলি খান  : মানুষের ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব না। আমরা ঘুরে দাঁড়াতে দেখেছি। তবে কবে, কীভাবে দাঁড়াবে তা বলা যাচ্ছে না। অপেক্ষা করতে হবে।
তবে আমি মনে করি, যাই ঘটুক, তা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঘটতে হবে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়া কারও পক্ষে পরিবর্তন আনা সম্ভব না। রাজনৈতিক কোনো শক্তিকে যদি বসানো যায়, তাহলে তার ভাবশিষ্যরা পরিবর্তনে সহায়তা করতে পারবে। কিন্তু অন্য কেউ আসলে আমলাতন্ত্রের সহায়তা নিতে হবে। আমলাতন্ত্র দিয়ে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।
সাপ্তাহিক : অন্য কোনো শক্তি বলতে কী বোঝাচ্ছেন?
ড. আকবর আলি খান : অনেক কিছুই তো দেখলাম। শক্তির ব্যাপারে সবাই অবগত। আকস্মিকভাবে ক্ষমতায় এসে নানা খেল দেখাতেই পারে। কিন্তু তাতে লাভ হবে না। তারা স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না। এই উপলব্ধি রাজনৈতিক দলগুলোরও জানা আছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, তারা ভুলে যায়।  
সাপ্তাহিক : জাতীয় ঐক্য গড়ার প্রত্যয়ে ড. কামাল হোসেনরা চেষ্টা চালাচ্ছেন, হয়তো আপনি অবগত আছেন। এই চেষ্টাকে কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন?
ড. আকবর আলি খান : আমাদের রাজনীতি দুষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে অধিক মাত্রায় বিভাজন। বিভাজনই রাজনীতির বেশি ক্ষতি করেছে। বিশেষ করে বামপন্থি নেতারা চরম আস্থা সংকটে  ভোগেন। তাদের অনেকেই লেনিন বা মাও সেতুং হতে চান এবং ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে বিভক্তি সৃষ্টি করেন। দল ছেড়ে এসে প্রত্যেকে আবার নতুন দল খুলছেন। বাংলাদেশের ইতিহাস তাই বলে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে ঐক্যের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই, বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারা বুঝতে পারেন যে সবার পক্ষে লেনিন বা মাও সেতুং হওয়া সম্ভব না। পরিবর্তনের জন্য তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি কাঠামো দাঁড় করায়, তাহলে সেটা ভালো কিছু হবে বলে মনে করি। কিন্তু ঐক্য হলেই যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সাপ্তাহিক : তবুও এই ঐক্য প্রচেষ্টাকে ইতিবাচকভাবে দেখা যায় কীনা?
ড. আকবর আলি খান : আমি তো এই চেষ্টাকে সাধুবাদ জানালাম। বিভক্তির ধারা যত কমবেÑ সমাজে, রাজনীতিতে তত শান্তি প্রতিষ্ঠা পাবে। যারা ঐক্যের কথা বলছেন, তারা বিভিন্ন দল থেকে বেরিয়ে আসা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারাও নানাভাবে হতাশার জন্ম দিয়েছে। বিভক্তির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে তারা কতটুকু ঐক্য তৈরি করতে পারবেন, তা নিয়ে জনমনে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। একত্রিত হলেই রাজনীতির মাঠে ঐক্য অটুট থাকে না।
সাপ্তাহিক : ভারত প্রসঙ্গে আসি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ভারত ফ্যাক্টর’ আবশ্যক হয়ে উঠছে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতি ভারতমুখী। আপনার বিশ্লেষণ কী?
ড. আকবর আলি খান : ভারত আমাদের অনেক বড় প্রতিবেশী রাষ্ট্র। বাংলাদেশের তিন দিকেই ভারতের সীমানা। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অচ্ছেদ।
আবার সংখ্যালঘু রাজনীতিও ভারত-বাংলাদেশের জন্য একটি ফ্যাক্টর। বাংলাদেশে যেসব সংখ্যালঘু রয়ে গেছেন, তারাও ভারতের রাজনীতিতে কিছুটা হিসাব-নিকাশের মাত্রা যোগ করে। এসব কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব কাজ করে আসছে।
সাপ্তাহিক : কিন্তু ভারতের প্রভাব বিস্তারের মাত্রা বাড়লো কীনা?
ড. আকবর আলি খান : বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব আসলে কতটুকু কার্যকর হবে তা সময়ই বলে দেবে।
বাংলাদেশের বিষয়ে ভারত আগে এত মাথা ঘামায়নি। ইতিহাস তাই বলে। কিন্তু ভারত বাংলাদেশের সব বিষয়েই নজর দিচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে বাংলাদেশে ভারতের বাণিজ্য, অর্থনীতি, তাদের জাতীয় নিরাপত্তা। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, বাংলাদেশের রাজনীতি ভারতের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এমনটি মেনে নেয়ার মতো নয়।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পরেও ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। যদিও অনেকেই হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করেছিলাম। আমি নিজেও ইন্দিরা গান্ধীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলাম ওই সময়ে। কিন্তু হস্তক্ষেপ করেনি। এটি ছিল ইন্দিরা গান্ধীর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নগ্ন হস্তক্ষেপ না করেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
সাপ্তাহিক : এখন কী বলবেন?
ড. আকবর আলি খান : ভারত আগের নীতি থেকে সরে এসেছে বলে মনে করি। তারা বাংলাদেশের বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার নীতি অবলম্বন করছে।
সাপ্তাহিক : এই হস্তক্ষেপের ফল কী হতে পারে?
ড. আকবর আলি খান : বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে ভারত বড় ভুল করছে। যে আশায় ভারত এমন আচরণ করছে তা পুরোপুরি পূরণ নাও হতে পারে। কারণ সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করছে তারা।
তবে বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারত আসলে কী করতে চাইছে, তা বোঝা মুশকিল। ভারত একটি দেশ। তাদের রাজনীতির সংজ্ঞা ব্যাপক। তাদের রাজনীতি আসলে কোন দিকে সেটাও দেখার বিষয়।
সাপ্তাহিক : আপনি হয়তো লক্ষ্য করছেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির পরিবর্তন। ভারতের আনুগত্য থেকে অন্য রাষ্ট্রগুলো বেরিয়ে আসছে। বাংলাদেশ পারছে না কেন?
ড. আকবর আলি খান : বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দৈন্যতা এর একটি কারণ। আবার বাস্তব পরিস্থিতিও দেখতে হবে। ভারতের রাজনীতি পৃথিবীর মধ্যে বিশেষ জায়গা করে নিচ্ছে। ভারতের সামরিক শক্তিকেও এখানে হিসাবে নিতে হচ্ছে।
তবে আমাদের এমন নীতি হওয়া উচিত যে আমরা ভারতের সঙ্গে খারাপ কোনো সম্পর্কে জড়াবো না, আবার একেবারে আনুগত্যে নতিস্বীকার করব না। কিন্তু রাজনীতি এমন দ্বান্দ্বিক অবস্থায় গেছে যে, অন্যের প্রতি আনুগত্য চরমে, অথচ নিজের দেশের প্রতি আনুগত্য নেই।
সাপ্তাহিক : চীন কীভাবে নজর রাখছে বাংলাদেশে?
ড. আকবর আলি খান : চীন ভিন্ন কৌশলে নজর রাখছে বাংলাদেশে। ভারত আর চীনের নীতি আলাদা। চীন দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে। কিন্তু চীনের বিনিয়োগ নীতি পুরোপুরি সফল হবে কীনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে এবং এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নীতিতে চীনের পরিবর্তনও আসতে পারে।
সাপ্তাহিক : রোহিঙ্গা সংকটে এক বছর পার হলো। রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চুক্তিও হলো। কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।
ড. আকবর আলি খান : রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মিয়ানমারের কাছে এখনও বাংলাদেশ স্পষ্ট করে কিছু তুলে ধরতে পারেনি।
বিমসটেক সম্মেলনে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে বলে আমরা জানতে পারিনি। বাংলাদেশ এখন এই সংকটের সমাধান চায় কীনা, তাই নিয়ে মিয়ানমার এখন সন্দিহান।
সাপ্তাহিক : কী করা উচিত বাংলাদেশের?
ড. আকবর আলি খান : রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশ তৈরি করেনি। মিয়ানমার করেছে। সুতরাং এ নিয়ে মিয়ানমারের বিপক্ষে যা করার তাই করা উচিত ছিল। যেমন বিমসটেক সম্মেলনে বাংলাদেশে জোরালো অবস্থান নিয়ে কথা বলতে পারত। আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা দরকার ছিল।
মিয়ানমার যদি মনে করে যে, বাংলাদেশের অবস্থানে অস্পষ্টতা আছে, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করি না।
সাপ্তাহিক : রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা উঠলে ভারত-চীনের প্রসঙ্গও আসে। বাংলাদেশ তো এ দুটি দেশ বাগে আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
ড. আকবর আলি খান : কিন্তু আলোচনার তো বিকল্প নেই। ভারত, চীন, রাশিয়ার ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
মিয়ানমারে এই দেশগুলোর অনেক বেশি স্বার্থ আছে। অস্ত্র বিক্রি, সে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, বিনিয়োগ নিয়ে ভারত, চীন, রাশিয়ার অন্য হিসাব থাকতেই পারে। তাই বলে বাংলাদেশ তো বলি হতে পারে না। এটি বিশ্বকে বোঝানোর ব্যাপার।
সাপ্তাহিক : আসামের বাঙালি সংকট আরেক রোহিঙ্গা সংকট বলে মনে করা হচ্ছে। আপনি কী দেখছেন?
ড. আকবর আলি খান : আসামের বিষয়টি এখনও স্পষ্ট না। আসামের বাঙালি সমস্যা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে। এ নিয়ে সে দেশেই বিতর্ক আছে। পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্যোগ নিয়ে কথা বলছেন। সময় বলে দেবে, আসলে সেখানে কী হচ্ছে?

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.