টার্গেট নির্বাচন : চলছে বিতর্ক -শুভ কিবরিয়া

Print Friendly and PDF

সামনে একাদশ দশম সংসদ নির্বাচন। কেমন হবে সেই নির্বাচন? আদৌ কি সঠিক সময়ে নির্বাচন হবে? হলে সেই নির্বাচনের ধরন কেমন হবে? নির্বাচনকালীন সরকারের চেহারাটাই বা কেমন হবে? সেই নির্বাচনে প্রতিনিধিত্বশীল সকল রাজনৈতিক দল কি অংশ নিতে পারবে? নির্বাচনের মাঠ সবার জন্য কতটা সমতা নিশ্চিত করতে পারবে নির্বাচন কমিশন? সবচেয়ে বড় কথা সামনের নির্বাচনে কি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তি ঘটবে? নাকি, রাজনীতিবিদদের প্রতিপক্ষ নির্মূল আকাক্সক্ষার ওপর ভর করে এক এগারোর ভূত আবার সওয়ার হবে জাতির কাঁধে, অন্য নামে, ভিন্ন কোনো ফর্মে? নাকি, সবার আশঙ্কা উড়িয়ে একটা সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য, প্রতিনিধিত্বশীল অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পা রাখবে এক নতুন অভিযাত্রায়! এসব প্রশ্ন, আশঙ্কা, আশাবাদের সম্ভাবনার মধ্যে জাতীয় জীবনে কতগুলো বিতর্ক নতুন করে রাজনীতির হাওয়া গরম করছে।
বিতর্কের প্রথম হাওয়াটা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশন হঠাৎ করে নির্বাচনে ইভিএম মেশিন প্রচলনের উদ্যোগ নিয়ে এক বিতর্কের সূত্রপাত করে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়াই আগামী নির্বাচনে ইভিএম মেশিন ব্যবহারের জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধনের উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন। ইভিএম মেশিন কেনার জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্পও সামনে চলে আসে। সরকারি দলের নেতাদের সমর্থনও মেলে এই আয়োজনে। বিএনপিসহ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের বাইরে থাকা দলগুলো এ বিষয়ে তীব্র আপত্তি তুললে শুরু হয় বিতর্ক। এক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার আসন্ন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার বিষয়ে সাতটি পয়েন্ট তুলে নোট অফ ডিসেন্ট দেন। বিতর্ক আরও বেগবান হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অপরাপর নির্বাচন কমিশনাররা অধিকতর দ্রুতগতিতে ইভিএম মেশিন কেনার ব্যাপারে তৎপর হন। ইতোমধ্যে বিমসটেক সামিট শেষে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে তাড়াহুড়ো করে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মত প্রকাশের পরপরই ইভিএম ব্যবহারের আওয়াজ ক্রমশ ঘুরে যেতে থাকে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ (সিইসি) আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা যারা এতদিন সিইসির সুরে সুর মিলিয়ে ইভিএম ব্যবহারের জিকির করছিলেন তারাও চুপসে যেতে থাকেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যে নির্বাচন নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আগামী নির্বাচন ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮ হতে পারে বলে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন। সংসদ নির্বাচনের  তারিখ ঘোষণার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের। সরকারের কোনো মন্ত্রী এই দায়িত্ব নিতে পারেন না। ফলে আবার বিতর্ক শুরু হয়। নির্বাচন কার কথায় কবে হবে? নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করছে সরকার, নির্বাচন কমিশন নয়! আসলে নির্বাচন কমিশন সরকারের হয়েই পারফর্ম করছেÑ এই পুরনো অভিযোগ নতুন করে বিতর্ক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। সিইসি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবার কিছুটা বিব্রত হয়ে বলেই ফেলেন, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা অর্থমন্ত্রীর কাজ নয়। তাছাড়া এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনেরও কোনো আলোচনা হয়নি। বাংলাদেশে কোনটা কার কাজ আর কে কোনটা করে তা নিয়ে বিতর্ক সবসময়ই ছিল। সরকারি দলও অর্থমন্ত্রীর নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা আর সিইসির বক্তব্যে কিছুটা বেকায়দায় পড়ে। নির্বাচন কমিশন আদতে সরকারের কথাতেই চলে-ফিরে এই অভিযোগ খ-াতে সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও মাঠে নামেন। তিনি বলেন, ‘৭ ডিসেম্বর নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ, এটা নিশ্চিত হলেও তা বলার দায়িত্ব আমাদের না, এটি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। নির্বাচন কমিশনকে বিব্রত করা আমাদের কাজ নয়।’
এই বিতর্কের মধ্যে বেকায়দায় পড়া অর্থমন্ত্রী তার আগের বক্তব্যে কিছুটা সংশোধন আনেন। তিনি বলেন তার এই বক্তব্যটি ছিল অনুমাননির্ভর। অবশ্য এই বিতর্ক নির্বাচন কমিশনের কর্মকা- সম্পর্কে মানুষের সন্দেহ ও অবিশ্বাস হয়তো আরও বাড়িয়ে তুলল। কেননা ইতোপূর্বে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা নিয়ে একই রকম ঘটনা ঘটেছিল। ১৯ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরিকল্পনা ছিল নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। ইসি তফসিল ঘোষণা করার আগেই আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলে দিয়েছিলেন, ১৯ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পরে ইসি ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করে তফসিল দেয়।

দুই.
নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। এই নির্বাচন কমিশন কতটা সংবিধানবান্ধব, কতটা সরকারবান্ধব সেই তুল্যমূল্য বিচারের সুযোগ আছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন বিশেষ করে নিবন্ধিত সব দলের প্রতিনিধিত্বমূলক, গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু একটি নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি করা খুব সহজ কাজ নয়। এই দুরূহ অথচ প্রয়োজনীয় কাজটি করতে নির্বাচন কমিশনের যে প্রাতিষ্ঠানিক সততা ও গ্রহণযোগ্যতা লাগে, সিইসি নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন সেই ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বরং জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অনিয়ম হবে এই ভবিষ্যদ্বাণী করে তিনি জাতির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে বিপদাপন্ন করে তুলেছেন। এই বিপদের মাথায় আরেকটি নতুন বিতর্ক রাজনীতির মাঠে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
সেটি হচ্ছে কারাগারে আদালত স্থাপন বিতর্ক। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের কারাদ-ে দ-িত হয়ে নির্জন কারাবাসে অভ্যন্তরীণ আছেন বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর অবস্থানকালেই সেখানে আবার অস্থায়ী আদালত বসিয়ে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিচারের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এই মামলার প্রধান আসামি খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে এনে বিচারের জন্য হাজির করা হয়েছে। কারাগারের ভেতর আদালত বসানো নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। বিএনপিপন্থি আইনজীবীসহ বিএনপির অভিযোগ হচ্ছে কারাগারের ভেতর আদালত বসানো অসাংবিধানিক। বেগম জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করতেই সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করছে। কারা অভ্যন্তর থেকে ৬ মাস ২৪ দিন পর বেরিয়ে খালেদা জিয়া এই আদালতে উপস্থিত হয়ে বলেছেন তিনি অসুস্থ। বাঁ পা ঠিকমতো রাখতে পারেন না, প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা, বাঁ হাতেও অনেক ব্যথা। তিনি আদালতকে স্পষ্ট করে জানান দেন, এ আদালতে ন্যায়বিচার নাই। তাঁর ভাষায়, ‘বিচারক যতদিন ইচ্ছা সাজা দিয়ে দিতে পারেন। সাজাই তো হবে, ন্যায়বিচার নাই এখানে।’
খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যের পর সাড়া দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে কারাগারে আদালত বসানোর রেওয়াজ নতুন নয়, পুরনো। বিডিআর মামলার বিচার কারাগার স্থানে আদালত বসিয়ে করা হয়েছে। জিয়াউর রহমানই প্রথমে কারাগারে আদালত বসিয়ে কর্নেল তাহেরের বিচার করেছিলেন। সেই বিচারে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি হয়েছিল।

তিন.
বেগম জিয়ার অসুস্থতা নিয়েও বিতর্ক চলছে। বেগম জিয়া গুরুতর অসুস্থ এই দাবি তুলে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার দাবি করছেন তিনি ও তাঁর দল বিএনপি। এমনকি বিএনপি অভিযোগ করছে কারাগারে বেগম জিয়াকে হত্যা করার অভিপ্রায়ে তাঁর সুচিকিৎসা করতে চাইছে না সরকার। অন্যদিকে সরকার বলছে সরকারি হাসপাতালে তিনি চিকিৎসা নিতে পারেন। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের উপরে অনাস্থা বেগম জিয়ার। কারাবিধি অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালের সরকারি চিকিৎসকদের প্রাপ্য চিকিৎসা বিএনপি নেত্রীকে স্বস্তি দিচ্ছে না। অপরপক্ষে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের একটি দল বেগম জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তাঁর সুচিকিৎসা জরুরি বলে দাবি করেছেন। সরকারপক্ষের দাবি দ-িত আসামির জন্য সরকারি হাসপাতালেই পর্যাপ্ত সুচিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। বিএনপির দাবি ১/১১-এর সময় কারাভ্যন্তরীণ শেখ হাসিনাকে তাঁর অভিপ্রায় অনুযায়ী দেশের বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সুবিধা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে এখন বেগম জিয়ার ক্ষেত্রে সেই সুবিধা দিতে চাইছে না।
বেগম জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে তাই বিতর্ক থামছে না।

চার.
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচনের আগে এত বিতর্কের কারণ কী? এই বিতর্ক দেশকে কি কোনো সংকটে ফেলবে? আমরা কি আবার বড় কোনো অরাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছি? অবশ্য প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেই ফেলেছেন, দেশের কিছু মানুষ সংকটে উত্তর পাড়ার দিকে চেয়ে থাকে। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য কি শুধু কথার কথা, নাকি এর অন্য কোনো গূঢ় অর্থ আছে? প্রশ্ন উঠতে পারে, এসব কথা এখন বলছেনই বা কেন প্রধানমন্ত্রী!
সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন। তবে আমরা যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অতীত অভিজ্ঞতা আর ইতিহাসের দিকে তাকাই তবে বলতেই হয়, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সরকারের পক্ষে রাজনৈতিক সুস্থিতি নিশ্চিত করা সহজ হয়নি। বরং নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সরকার, সব সময় দেশকে একটা বড় সংকটের দিকেই ফেলেছে।

পাঁচ.
২০১৮ ডিসেম্বরের শেষে অথবা জানুয়ারি ২০১৯-এর প্রারম্ভে যখনই একাদশ সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হোক না কেন, তার জন্য চাই বিতর্ক ও উত্তেজনা ছাড়া একটা সুস্থিত পরিবেশ। নির্বাচন নিয়ে সুস্থিতির জন্য চাই নির্বাচন কমিশনের দৃঢ় ও আস্থাভাজন ভূমিকা। সকল বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে ন্যূনতম সমঝোতা না থাকলে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার কাজটা সহজ হয় না। এই সব বিতর্ক তাই একটা অনিশ্চয়তার কালো মেঘ তৈরি করছে।
এই কালো মেঘ যাতে রাজনীতিতে কোনো অবাঞ্ছিত ঝড় তৈরি না করে সেদিকে সবার নজর দেয়া দরকার। সবার দায়িত্বপূর্ণ আচরণ তাই কাম্য। সকল রাজনৈতিক দল, দেশের সকল সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হচ্ছে জনবান্ধব দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করে জনআস্থা অর্জনের চেষ্টা করা।
কিন্তু বড় প্রশ্ন হচ্ছে, বেড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধবে কে?

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
Author : রুমী
বর্তমানের পুলিশ শাসিত রাষ্টে আগামী নির্বাচনে গণমাধ্যম কর্মিরা কতটা ঝুকিঁমুক্ত ? কতটা শর্তক তাদের নিরাপত্তা দানে সরকার ? যদিও বা পুলিশ দেশের প্রতিটি থানা পর্যায়ের সম্ভাব্য পিজাইডিং অফিসার, পুলিশ এজেন্ট এবং সর্বপরি ভোট কেন্দ্র এলাকার প্রভাব বিস্তারকারীদের নাম তালিকা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিরা যে দলেরই থাকুক না তারা কি ভোট গ্রহণের সময় আইনের আওতায় থাকবে না কি উল্টোরথ টেনে স্ব স্ব দলের জন্য নিবেদিত হয়ে ভোটার বিহীন ভোট গ্রহণে উত্তীর্ণ হবে ?
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.