ফেরার লড়াই : জয়ী হবেন আশরাফুল!

Print Friendly and PDF

মোয়াজ্জেম হোসেন রাসেল

জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন নান্নু। পাঁচ বছর নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে গত ১৩ আগস্ট মুক্ত হওয়া মোহাম্মদ আশরাফুলকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘আশরাফুল অনেক দিন ধরেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেই। সুতরাং ঘরোয়া ক্রিকেটে সব ফরম্যাটে তাকে খেলতে হবে। ওর ফিটনেস আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জন্য ঠিক আছে কি না, সেটা দেখতে হবে। সাসপেনশন যাওয়ার পর সব ফরম্যাটে খেলুক, তারপর এক বছর যাওয়ার পর বুঝতে পারব তার ফিটনেস কোন লেভেলে আছে।’ নান্নু আরও বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে থাকা একজনকে হুট করেই দলে নেয়ার সুযোগ নেই। ‘এ’ দলের পাশাপাশি অ্যাকাডেমি দলে যারা রয়েছেন তাদের ফিটনেস সম্পর্কে আমরা জানি কিন্তু আশরাফুলের ফিটনেস নিয়ে কিছুই জানি না। সে দীর্ঘদিন জাতীয় দলে খেলেছে। এখন তাকে প্রমাণ করে তবেই আসতে হবে’।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক ও মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস মোহাম্মদ আশরাফুলের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরা সম্পর্কে বলেন, ‘আশরাফুল এখন সবেমাত্র আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য নিষেধাজ্ঞামুক্ত হয়েছে। তাকে এখনি জাতীয় দলে বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। বিপিএলে খেলার জন্য সে এখন মুক্ত। এখন এটি নির্ভর করছে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের ওপর। যেহেতু সে সবকিছু থেকে মুক্ত হচ্ছে তাই বিপিএলে খেলতে পারবে। এখন তাকে নেয়া না নেয়ার ব্যাপারটি ফ্র্যাঞ্চাইজিদের ওপর। এক কথায় বললে আশরাফুল একটি নাম। এখানে দশ জন ক্রিকেটার যেভাবে জাতীয় দলে আসে সেভাবেই আশরাফুলকে আসতে হবে। আপনারা জানেন যে পাঁচ বছর সে ক্রিকেটের বাইরে ছিল। ঘরোয়া ক্রিকেটের দুটি আসরে সে খেলেছে। কিন্তু সেটি যথেষ্ট নয়। তার ফিটনেসের ব্যাপার আছে। আর আশরাফুল নির্বাচকদের ভাবনায় আছে কিনা সেটি আমরা জানি না। সবকিছুর জন্য সময়ের অপেক্ষা করতে হবে।’
জাতীয় দলের দীর্ঘদিন ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেছেন খালেদ মাহমুদ সুজন। ছিলেন জাতীয় দলের অধিনায়কও। মোহাম্মদ আশরাফুলের নিশেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরার প্রসঙ্গে সুজন বলেন, ’মোহাম্মদ আশরাফুল একজন পরীক্ষিত পারফর্মার। জাতীয় দলের অনেক অর্জনের সঙ্গেই তার নামটি জড়িয়ে রয়েছে। জাতীয় দলের জন্য নিজেকে যোগ্য মনে করলে আমাদের তো কিছুই করার নেই তাকে নেয়া ছাড়া। আপনাদের মনে রাখতে হবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে থাকা একজন ক্রিকেটার নিজেকে ফিট মনে করলেও সে কতটা ফিট সেটা প্রমাণের বিষয় রয়েছে। জাতীয় দলের পাইপলাইন মজবুত করতে আমরা ‘এ’ দল ও অ্যাকাডেমি দলের ওপর বেশি জোর দিয়েছি। তাদের মতো ফিট থাকলেই কেবল বিবেচনায় আসতে পারে’।
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) ম্যাচ গড়াপেটায় জড়িত থাকার স্বীকার করে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন। ২০১৩ সালে ম্যাচ পাতানো এবং স্পট ফিক্সিংয়ের দায়ে অভিযুক্ত হন আশরাফুল। যে কারণে পরের বছর বিপিএল এন্টি করাপশন ট্রাইব্যুনাল তাকে ৮ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে। সঙ্গে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে। তবে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে বিসিবি’র ডিসিপ্লিনারি প্যানেল ওই সাজা কমিয়ে পাঁচ বছর করে। অবশ্য বোর্ডের অনুমতি নিয়ে গেল দুই বছর ধরে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলছেন এ ডানহাতি ব্যাটসম্যান। কিন্তু বিপিএলসহ ফ্রাঞ্চাইজি কোনো টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পাননি। তবে এখন থেকে সব ধরনের ক্রিকেটে খেলার ছাড়পত্র পাচ্ছেন তিনি। বলা যায় সাবেক এ অধিনায়ক এখন ’কলঙ্কমুক্ত’।
ওয়ানডে ও টোয়েন্টি-২০’তে গত কয়েকমাস ধরে ভালো খেলছে বাংলাদেশ। যে কারণে রঙিন পোশাকের ক্রিকেটে আশরাফুলের ফেরাটা যে অনেক কঠিন হবে সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সেটা হয়তো সাবেক এ তারকা ব্যাটসম্যান নিজেও ভালো করে উপলব্ধি করতে পারছেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন টেস্টে তার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই চিন্তাও আপাতত নেই টাইগারপ্রধান নির্বাচকের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তো নয়ই, সামনের ঘরোয়া মৌসুমটা দেখে তবেই তাকে বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ২০১৬ সালে জাতীয় লিগ দিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে ফেরেন আশরাফুল। ঢাকা মহানগরের হয়ে ৫ ম্যাচে ২০.৫০ গড়ে করেছিলেন মাত্র ১২৩ রান। এরপর ২০১৭-১৮ মৌসুমে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে পাঁচটি সেঞ্চুরি করেন আশরাফুল। তার দল কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের হয়ে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে এ অর্জন করেন টেস্ট ক্রিকেটের সর্বকনিষ্ঠ এ সেঞ্চুরিয়ান।
তার আগে এমন কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন কেবল ২০১৫-১৬ মৌসুমে মোমেন্টাম ওয়ানডে কাপে দক্ষিণ আফ্রিকার আলভারো পিটারসন। নিষেধাজ্ঞা উঠার পর ২৩টি লিস্ট ‘এ’ এর ম্যাচে আশরাফুলের গড় ৪৭.৬৩ হলেও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১৩ ম্যাচে তার গড় ২১.৮৫। যদিও একটি মৌসুম দিয়ে একজন ব্যাটসম্যানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার কোনো সুযোগ নেই। মাথার উপর নিষেধাজ্ঞার খড়গ থাকলে খুব যে ভালো খেলা যায় না সেটা অনেক ব্যাটসম্যান দিয়েই প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে ফেরার পর রান করে আলোচনায় আসলেও কিছুটা ধীরস্থির গতিতে ব্যাট করায় সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। আশরাফুলের যখন নিষেধাজ্ঞা কাটল তখন ৩৪ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। যে কারণে জাতীয় দলে ফেরার লড়াইয়ে ১৭৭টি ওয়ানডে ও ৬১টি টেস্ট খেলা এ লিটল মাস্টারের হাতে সময়ও রয়েছে কম। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এত বছর বয়সে ফেরার রেকর্ডও যে নেই। ইতিহাস থেকে তাই হতাশ হতে হবে তাকে। যদিও প্রধান নির্বাচক মানছেন, ব্যাটসম্যানদের জন্য মধ্য তিরিশ দারুণ বয়স। এই বয়সে ব্যাটের ধার আরও বাড়ে। সেটা আশরাফুলের বাড়লেই জাতীয় দলের জন্য বিবেচনায় আসতে পারেন। জাতীয় দলে আশরাফুল কবে ফিরবেন, এ নিয়ে আপাতত ভেবে লাভ নেই। তার এখন ফিটনেস নিয়ে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে ঘরোয়া লিগে অন্য প্রতিযোগীদের সঙ্গে সমান তালে লড়াই করতে হবে। সে কারণে ফেরার লড়াইটা যে মোটেও সহজ নয় সেটা জানেন আশরাফুল নিজেও। নিষেধাজ্ঞা কাটানোর সময় তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডে। সেখান থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেন, ‘আমি এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম। এখন নিজেকে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার লড়াইয়ে। জানি কাজটা সহজ হবে না তবে আমিও হাল ছাড়ছি না। নিজেকে প্রমাণ করতে যা যা করা প্রয়োজন সবই করব’।
২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট থেকে ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার ছাড়পত্র দেয়া হয় তাকে। আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার অপেক্ষাটা যে দুই বছর বেশি ছিল তার। নিষেধাজ্ঞা মুক্তির সময়ে ইংল্যান্ড সফরে রয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়ক। সেখানে ইংল্যান্ডের ঘরোয়া টুর্নামেন্টে খেলছেন। আর সেখানেই ব্যাটে রানের জোয়ার আশরাফুলের। নিষেধাজ্ঞা মুক্তির আগের দিন যেমন ৪০ ওভারের ম্যাচে ৯৪ রানের ইনিংস খেলেছেন আশরাফুল। এছাড়া একম্যাচে একটি শতকও হাঁকিয়েছেন তিনি। টোয়েন্টি-২০ টুর্নামেন্টে ৯৭, অপরাজিত ৭৬ ও ৪৪ রানের ইনিংসও খেলেছেন। এক ম্যাচে অবশ্য শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ফর্মটা হাজার মাইল দূরের দেশে নিয়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম এই সুপারস্টার। গত জুলাইয়ে পঁয়ত্রিশে পা দিয়েছেন আশরাফুল। পাঁচ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে ছিলেন। অবশ্য আশরাফুল ফিটনেস ধরে রাখার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে নিষেধাজ্ঞা ওঠার আগে বিভিন্ন দেশে গিয়ে প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছেন। ২০১৬ সালে ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে সাড়া জাগান। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে অধিকাংশ সেঞ্চুরি এসে তিন নম্বরে ব্যাটিং করে। জাতীয় দলে ফিরলে আশরাফুল কোন পজিশনে খেলবেন? ওপেনিংয়ে তামিমের সঙ্গে হয়তো লিটন দাস, ইমরুল কায়েস না হয় সৌম্য সরকার ব্যাটিং করছেন। তিন নম্বরে বেশ রদবদল হয়েছে। সর্বশেষ সিরিজে সাকিব আল হাসান তিন নম্বরে সাফল্য দেখিয়েছেন। এরপর মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ রিয়াদও নিজের জায়গা স্থায়ী করে নিয়েছেন। এরপরের অবস্থানে তরুণরা রয়েছেন। আশরাফুলের ফেরার জায়গাটা তাই অনেক কঠিনই বলতে হবে। আশরাফুল নিজেও জানেন বাস্তব অবস্থাটা।
এখন পারফরম্যান্স দেখিয়ে জাতীয় দলে ফেরার সেই আত্মবিশ্বাস তার মধ্যে রয়েছে। জাতীয় দলে সাবেক সতীর্থদের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রয়েছে আশরাফুলের। সামনে অনেক সুযোগ থাকছে আশরাফুলের। ঘরোয়া ক্রিকেট ও বিপিএলের আসর রয়েছে। যেখানেই সুযোগ পান যদি ফিটনেস ও পারফরম্যান্সে অবিশ্বাস্য কিছু করে দেখাতে পারেন, তাহলে তার ফেরার রঙিন স্বপ্ন সত্যি হতে পারে। বয়স বিবেচনা করলে তুষার ইমরান, আব্দুর রাজ্জাকের মতো খেলোয়াড়রা যদি ‘এ’ দল ও জাতীয় দলে ডাক পেতে পারেন তাহলে আশরাফুল কেন নয়? তবে ফিটনেস ও পারফরম্যান্স দেখানোর পরই আশরাফুল বিবেচিত হতে পারেন বাংলাদেশ দলে। এছাড়া অভিজ্ঞতাও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
২০১৯ বিশ্বকাপে আশরাফুলের ফেরা উড়িয়ে দেওয়া যায় না! সেই আশাতেই এখন দিনাতিপাত করছেন তিনি। বর্তমানে জাতীয় দলের পাইপলাইনকে মজবুত করতে হাই পারফরম্যান্স ইউনিট, একাডেমি দল এবং ‘এ’ দলের খেলোয়াড়দের দিকেই শুধু নজর রাখছেন নির্বাচকরা। সারাবছর নিবিড় অনুশীলনের সুযোগ পাচ্ছেন তারা। ভালোমানের কোচদের তত্ত্বাবধানে থাকার পাশাপাশি ফিটনেস ক্যাম্প এবং জিম সুবিধা পাচ্ছেন যারা, ঘুরে-ফিরে দলে তাদেরই বিবেচনায় আনা হচ্ছে। এটা যদিও অস্বাভাবিক বিষয় নয়। কারণ যারা ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফর্ম করছেন আর জাতীয় দলের বাইরে রয়েছেন তাদের নিয়ে আবর্তিত হচ্ছে স্বপ্নটা। পাশাপাশি জাতীয় দলের সামনে রয়েছে ব্যস্ত সময়। এ মাসে সংযুক্ত আরব-আমিরাতে এশিয়া কাপ দিয়ে শুরু হবে ব্যস্ততার এই পর্ব। এরপর দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের পাশাপাশি বিদেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডকে মোকাবিলা করার কথা রয়েছে। এর মধ্যে অক্টোবরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, নভেম্বর-ডিসেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ এবং জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে নিউজিল্যান্ড সফর নির্ধারিত হয়ে আছে। যদিও এই তিনটি সিরিজের একটিতেও আশরাফুলের ফেরার সম্ভাবনা দেখছেন না নির্বাচকরা। তবে তার ফেরার রাস্তাটা নিজেকেই তৈরি করতে হবে। সেটা ঘরোয়া আসর দিয়ে।
mhrashel00@gmail.com

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.