ফুটবল কি আরও পিছিয়ে যাচ্ছে?

Print Friendly and PDF

মোয়াজ্জেম হোসেন রাসেল

ঘটনা-১ :
২০১৬ সালে বিশ্বকাপ প্রাক-বাছাইয়ের খেলায় ভুটানের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ভুটানের মাটিতে ৩-১ গোলের অসহায় আত্মসমর্পণ করে। ম্যাচটি আবার এশিয়া কাপেরও বাছাইয়ের খেলা ছিল। এই ম্যাচে হারের পর ফিফা ও এএফসির সব ধরনের ম্যাচ থেকে তিন বছরের জন্য বাইরে চলে চলে যায় বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় লালসবুজ পতাকাধারীদের।
ঘটনা-২ : ২০১৭ সালে সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ ছেলেদের ফুটবলে ভারতের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। এই ম্যাচে প্রথমার্ধেই ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, জাফর ইকবালরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ম্যাচটা ৪-৩ গোলে জিতেছিল বাংলাদেশ। অবিশ্বাস্য এই জয়ে বাংলাদেশ তো বটেই হতবাক হয়ে পড়েছিল ভারতও।
ঘটনা-৩ : ২০১৮ এশিয়ান গেমসের প্রথম ম্যাচে ৩-০ গোলে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে পরাজয়ে শুরু করেছিল বাংলাদেশ। এরপর শেষ মুহূর্তের গোলে থাইল্যান্ডের বিপক্ষে ড্র করে প্রথম পয়েন্ট পেয়েছিল জামাল ভুইয়ার দল। শেষ ম্যাচে আবারও শেষ মুহূর্তের গোলে কাতারকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছিল দ্বিতীয় রাউন্ডে। শেষ ষোল’র ম্যাচে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে লড়াই করে ৩-১ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ।
এই তিন ঘটনার বাইরে আরও টুকরো টুকরো ঘটনা রয়েছে বাংলাদেশের ফুটবলে। সেখানে অর্জন আর বিসর্জন দুটোই রয়েছে। তবে ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর ভুটানের রাজধানী থিম্ফুতে বাংলাদেশের পরাজয় একেবারেই খাদের কিনারে ফেলে দিয়েছিল বাংলাদেশকে। কোনোভাবেই আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। তিন বছরের জন্য আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়াটা বেশ ধাক্কা দেয় বাংলাদেশকে। এই সময়ে বাংলাদেশেও বসেনি জাতীয় দলের কোনো আন্তর্জাতিক আসর। গত ২৭ জুলাই লাওসের বিপক্ষে খেলে আবারো দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন খেলোয়াড়রা। সেই ম্যাচটাও পিছিয়ে পড়ে ড্র করেছিল বাংলাদেশ। এরপর এশিয়ান গেমসে যা করে দেখিয়েছে জেমি ডে’র শিষ্যরা সেটাকে ইতিহাস না বলে তো কোন উপায় নেই। কারণ এবারের আসরে দক্ষিন এশিয়া থেকে প্রতিনিধিত্ব করা সব দলই বিদায় নিয়েছে প্রথম রাউন্ড থেকে। ব্যতিক্রম ছিল কেবল বাংলাদেশ। ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ কাতারকে হারিয়ে যে যোগ্যতা অর্জন করেছিল এই দেশ সেটা অনেক বড় অর্জন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আর এখন তো খুঁজে পাওয়া গেছে সেই পুরনো বাংলাদেশকে। আগে থেকেই অনুমেয় ছিল বছরের শেষটা বেশ ব্যস্ততায় কাটবে বাংলাদেশের ফুটবলারদের। দেশে ও দেশের বাইরে খেলতে হবে অনেকগুলো ম্যাচ।
সেই প্রস্তুতিটা যে কোচ ভালোভাবেই খেলোয়াড়দের দিতে পেরেছেন সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই দলকে দুবার কাতারে আর একবার দক্ষিণ কোরিয়ায় কন্ডিশনিং ক্যাম্প করিয়ে আনা হয়েছে। খেলানো হয়েছে বেশকিছু প্রস্তুতি ম্যাচও। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ হিসেবে খ্যাত সাফ ফুটবলের আগে একটি মাত্র প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। সেটিতে শ্রীলংকার কাছে ১-০ গোলে পরাজয় দিয়ে শুরু করেছিল। রাজধানীর বাইরে নীলফামারীর শেখ কামাল স্টেডিয়ামে উপচেপড়া দর্শকদের হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল। তবে সাফ শুরু হতেই নতুন এক বাংলাদেশের দেখা পাওয়া গেছে। প্রথম ম্যাচে ভুটানকে ২-০ গোলে হারানোর পর দ্বিতীয় ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ১-০ গোলের জয় পায় বাংলাদেশ। গ্রুপের শেষ ম্যাচে নেপালের বিপক্ষে অবাক করা পরাজয় আবারও পিছিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশকে। তার আগে অবশ্য আলোর রেখা দেখা গিয়েছিল। হঠাৎ করে কি করলেন কোচ যে দলে এতটা পরির্বতন হলো। বাংলাদেশে কাজ করা বিদেশি কোচদের বেশিরভাগই নিজেদের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে থাকেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের পঞ্চম বিভাগে কাজ করা জেমি ডে নিজের মতো করে কাজ করার পাশাপাশি নজর দিয়েছেন অন্যদিকে।
স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় খাবার ভাত। আর তরকারিতে অতিরিক্ত তেল মসলার ব্যবহারও হয়ে থাকে। জেমি ডে শুরুতেই যখন দেখলেন খেলোয়াড়দের ফিটনেসের অবস্থা খারাপ তখন হাত দিলে খাদ্য তালিকায়। ভাত খাওয়া এককথায় নিষিদ্ধ করলেন। পাশাপাশি পুরোপুরি বর্জন করা হয়েছে তেল ও মসলা। শুধুমাত্র সিদ্ধ করেই শবজি খাওয়ানো হয়েছে এই কোচ আসার পর। পরিবর্তন যে হয়েছে সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যে বাংলাদেশ ৭০ মিনিট খেলার পর ক্লান্ত হয়ে পড়ত সেই দলটি এখন ৯০ মিনিট কেন ১২০ মিনিট খেললেও ক্লান্ত হয় না। পাশাপাশি শেষ দিকে গোল হজম করে পরাজয়ের যে ধারা শুরু হয়েছিল তার লাগাম টেনে ধরেছেন নতুন কোচিং স্টাফ। এর মধ্যে আবার কয়েকজনকে একটু আলাদা করতে হয়। তাদের মধ্যে সবার উপরের নামটি তপু বর্মন। ডিফেন্ডার হয়েও নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছেন। ভুটানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের মতোই পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচেও সেরা ফুটবলার হয়েছেন। বল ক্লিয়ার থেকে শুরু করে ওভারল্যাপ করে আবার আক্রমণেও বেশ দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। তার এভাবে উঠে আসাটা স্পেনের সার্জিও রামোস, জেরার্ড পিকেদের কথাই মনে করিয়ে দিল। বয়সে সবার ছোট হলেও এরই মধ্যে ক্ষুরধার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ দিয়েছেন সাদউদ্দীন। এতদিন দলে তার জায়গা ছিল ডিফেন্ডার হিসেবে। এখন কোচ তাকে লেফট উইংয়ে অসাধারণ এক খেলোয়াড়ের পরিণত করেছেন। বলা যায় লেফট উইংয়ে রীতিমতো ত্রাস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের ফুটবলে এমন কাউকে দেখার সুযোগ হয়নি। বলা যায় চোখ জুড়ানো ড্রিবলিং আর গতি দিয়ে প্রতিপক্ষ ডিফেন্সকে সর্বদাই ব্যতিব্যস্ত রেখেছেন।
বিশ্বের কোনো দলেই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের তেমন একটা কদর নেই। তারা মাঠে যে কাজটি করে থাকেন সেটিরও প্রচার তেমন একটা পান না। বাংলাদেশে জামাল ভুইয়া হচ্ছেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, ছোট করে বললে দলের প্রাণভোমরা। ডিফেন্সে মনোযোগ দেয়ার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের সীমানায় মুহুমুর্হু আক্রমণই যে তার প্রধান কাজ। দলের আরেক খেলোয়াড় ওয়ালি ফয়সাল। বয়সের কারণে তার খেলায় একটা ছাপ পড়েনি। মাঝমাঠ না পেরোনোটাই তার জন্য ভালো থাকলেও তিনি কারও বারণ মানেননি। ওভারল্যাপ করে উপরে উঠে আক্রমণেও বেশ পাকা এই লেফট ব্যাক। এই খেলোয়াড়দের দিয়েবেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশ দলে। এই দলটি এখন খেলছে হাইপ্রেসিং ফুটবল। কোচ জেমি ডে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই এই পদ্ধতিতে খেলোয়াড়দের খেলিয়ে আসছেন। এশিয়ান গেমসে যেমন দেখা গেছে ঠিক তেমনি সাফেও মিলেছে তার প্রমাণ। এই পদ্ধতিতে খেলে প্রতিপক্ষ দলকে নিচ থেকে বিল্ডআপ খেলতে বাধা দেয়া হয়। যাতে করে নিজেদের সীমানাটা সুরক্ষিত থাকে। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের পায়ে যত দ্রুত বলা যায় তার চেয়ে বেশি দ্রুতগতিতে বল কেড়ে নেয়া হয়। পাশাপাশি সামনের পাসিং পজিশনগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই কাজটি বেশ চতুরতার সঙ্গেই করতে পারছে বাংলাদেশ দল।
অন্ততপক্ষে জাতীয় দলের সাবেক দুই কোচ মারুফুল হক ও সাইফুল বারী টিটু বেশ নজর রাখছেন কোন পজিশনের কিভাবে কোচ জেমি ডে খেলোয়াড়দের খেলিয়ে যাচ্ছেন। এই পদ্ধতি মাঠে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়েছে খেলোয়াড়দের বয়স কম থাকার কারণে। বাংলাদেশের এই দলটি অনেকটাই অনূর্ধ্ব-২৩ দলের। সিনিয়র ৫-৬ জন খেলোয়াড় রয়েছেন। তবে প্রথম একাদশে সুযোগ পাচ্ছেন মোটে চারজন। বাকি সাতজনের গড় বয়স ২২ বছরেরও নিচে। যারা নিজেদের প্রমাণ করতে মুখিয়ে আছে। যার ফল বাংলাদেশ পেয়েছে এশিয়ান গেমসে আর পাচ্ছে সাফ ফুটবলেও। দারুণ ছন্দে রয়েছে বাংলাদেশ দল। তরুন এসব খেলোয়াড় পুরো মাঠেই নিজেদের দাপট ধরে রাখার চেষ্ট অব্যহত রেখেছেন। যে পরিবর্তনটা হওয়া খুব জরুরি সেটা এবার অনেক বছর পর হয়েছে। হার না মানার মানসিকতা তৈরি হলে তার প্রভাব কতটা পড়ে সেই বিষয়টিও আঁচ করা গেছে। দ্বিতীয় ম্যাচে খেলা প্রতিপক্ষ পাকিস্তান দলের খেলোয়াড়দের গড় বয়স ছিল ২৬ এর বেশি। বয়স বলছে তারা বেশ অভিজ্ঞ। কিন্তু মাঠে ঠিকই জয় এসেছে বাংলাদেশের। কারণ বয়সে তারা অনেক তরুণ। এবারের বিশ্বকাপের শিরোপা জেতা ফ্রান্স দলও ছিল তারুণ্যনির্ভর। তাদের শিরোপা জেতাও সহজ হয়ে যায়।
একটা সময় বাংলাদেশের স্ট্রাইকারদের পায়ে অনেক গোল থাকত। কিন্তু গত এক দশকে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। ঘরোয়া ফুটবলে দেশি স্ট্রাইকারদের সাইড বেঞ্চে বসিয়ে রেখে বিদেশিদের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল ক্লাবগুলো। এর অবশ্য কারণও রয়েছে। দলের জয়ে দেশিদের ভূমিকা রাখতে না পারাই ছিল বড় কারণ। কোচ জেমি ডে দায়িত্ব নেয়ার পর দুই ডিফেন্ডারকে দিয়ে চেষ্টা করেছেন স্ট্রাইকার বানানোর। মাহবুবুর রহমান সুফিল ও সাদ উদ্দিন তাদের মধ্যে অন্যতম। ইন্দোনেশিয়ার মাটিতে কাতার বধের নায়ক সাদ। আর ভুটানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে গোল পেয়েছেন সুফিল। এছাড়া ডিফেন্ডার হিসেবে প্রথম দুই ম্যাচে দুটি গোল করেছেন তপু বর্মন। তাহলে বলাই যায় বাংলাদেশ দল এখন আলাদা কোনো স্ট্রাইকারের উপর নির্ভরশীল নয়। কোচ হিসেবে সুফিলের গোল পাওয়াটা কোচের জন্য ছিল স্বস্তির। এছাড়া এশিয়ান গেমসে থাইল্যান্ডের বিপক্ষেও তিনি গোল করেছিলেন। পাকিস্তানের ব্রাজিলের কোচ বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলার আগে জানিয়েই দিয়েছেন, তারা নাকি সুফিলকে নিয়ে একটু বাড়তি বিশ্লেষণই করেছেন। বাংলাদেশের আরেকটা সমস্যা ছিল সেটপিসে গোল হজম করা। ছোট কিংবা বড় সব দলেই ফ্রি কিক থেকে গোল হজমের একটা ধারা তৈরি হয়েছিল। সেই অবস্থা থেকেও বের হতে পেরেছে বাংলাদেশ। এছাড়া গোলরক্ষকদের নিয়ে আলাদা কাজ করার কারণেও এই অবস্থার উন্নতি হয়েছে। সবদিক মিলিয়ে যদি বলা হয়, নতুন দিনের দেখা মিলেছে বাংলাদেশের ফুটবলে তাহলে কি খুব বেশি ভুল বলা হবে? আসলে সাফে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নেপালের বিপক্ষে পরাজয় ফেলে দিয়েছে নতুন ভাবনায়। এই ম্যাচটা যেখানে ড্র করলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ সেটিও পারল না বাংলাদেশ।
অনেক বছর পর টানা তিন ম্যাচে গ্যালারি ভর্তি দর্শকরা হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয়েছে। এক গোলরক্ষক শহিদুল আলম সোহেলই হাস্যকর ভুল করে বাংলাদেশকে বিদায়ের পথ দেখিয়েছেন। অথচ ভুটান ও পাকিস্তানের বিপক্ষে পজিটিভ ফুটবল খেলেছে স্বাগতিকরা। নেপালে এসে সেই জয়রথ আটকে গেল। দুই জয়ও পারল না তিন আসর পর সেমিফাইনালে নিয়ে যেতে। কাজি সালাউদ্দিন জমানায় টানা চার সাফের আসর থেকে খালি হাতে ফিরেছে বাংলাদেশ দল। বিদায় নিয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকে। তবে বিশ্লেষকদের অভিমত, এই দলটার পাশাপাশি কোচের উপর ভরসা রাখতে। দিন বদল হলে এদের দিয়েই সম্ভব। পিছিয়ে পড়ার চিন্তা করাটা হবে বোকামি।
mhrashel00@gmail.com

সাপ?তাহিক পতিবেদন

খেলা
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.