বিদায় এ্যালিস্টার কুক : রেকর্ডের ইতি এখানেই!

Print Friendly and PDF

সাইমন মোহসিন

এ্যালিস্টার কুক! এ যাবৎ ইংলিশ ক্রিকেটের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান। অসাধারণ এই ব্যাটসম্যানকে বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বশ্রেষ্ঠদের অন্যতম হিসেবে আখ্যাায়িত করলেও ভুল হবে না।
ক্যারিয়ার শেষ করছেন মোট ১৬১টি টেস্ট খেলে। ভারতের বিপক্ষে ওভালে খেলা শেষ টেস্ট ম্যাচটি হবে তার ক্যারিয়ারের একটানা খেলা ১৫৯টি টেস্ট। একটানা টেস্ট খেলা খেলোয়াড়দের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন কুক। একটানা এতগুলো টেস্ট খেলার রেকর্ড আর কারও নেই। তালিকার পরবর্তী চারজন ব্যাটসম্যান ইতোমধ্যেই অবসর গ্রহণ করেছেন। সুতরাং, অন্য কারও পক্ষে এই রেকর্ড ভঙ্গ করাটা কতখানি কঠিন হবে সেটা বোঝাই যায়।
কুকের দীর্ঘ ১২ বছরের ক্যারিয়ারে রেকর্ডের কোনো কমতি নেই। ইংলিশ ক্রিকেটে সর্বোচ্চ সংখ্যক টেস্ট খেলুড়ে খেলোয়াড় হিসেবে অবসর গ্রহণ করছেন তিনি। এই ১৬১টি ম্যাচে ১২,৩২৫ রান (ভারতের সঙ্গে চলমান টেস্টের প্রথম ইনিংস পর্যন্ত)। ইংলিশ ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ টেস্ট রানের অধিকারী তিনি। ইংলিশ ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান করা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন গ্রাহাম গুচ - ৮৯০০ রান নিয়ে। গ্রাহাম গুচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন ১৯৯৫ সালে। এত বছরে কেবল কুক তার সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড ভঙ্গ করতে সক্ষম হয়েছেন।
বিশ্ব ক্রিকেটে সর্বোচ্চ টেস্ট রান করা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে রয়েছেন কুক। পঞ্চম স্থানে রয়েছেন শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারা। চলতি টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে আর ৭৭ রান করতে পারলেই সাঙ্গাকারাকে টপকে এই তালিকার পঞ্চম স্থান দখল করবেন কুক।  
টেস্ট ক্রিকেটে একাধারে সর্বপ্রথম ৬০০০, ৭০০০, ৮০০০, ৯০০০, ১০০০০, ১১০০০ এবং ১২০০০ রানের মাইলফলক অর্জন করা সবচেয়ে তরুণ ব্যাটসম্যান হওয়ার রেকর্ডটিও এখন পর্যন্ত তারই।
ইংলিশ ক্রিকেটের সর্বোচ্চ টেস্ট সেঞ্চুরি (৩২টি) হাঁকানো ব্যাটসম্যান হচ্ছেন কুক। বিশ্ব ক্রিকেটে ৩০টি টেস্ট সেঞ্চুরি অতিক্রম করা ১৩তম ব্যাটসম্যান এ্যালিস্টার কুক।
শুধু টেস্ট ক্রিকেটই নয়, ক্রিকেটের অন্যান্য ফরম্যাটের রান যোগ করলে দেখা যায়, মোট ৩৭টি সেঞ্চুরি ও ১৫৫৯০ রান নিয়ে কুক ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ রান করা ব্যাটসম্যান। ইংলিশ টেস্ট দলের অধিনায়কত্ব পান তিনি ২০১০ সালে। অধিনায়কত্বের দায়িত্ব ২০১৭ সালে হস্তান্তর করা পর্যন্ত তিনি ৫৯টি ম্যাচে এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আর ইংলিশ টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ম্যাচে অধিনায়কত্ব করার রেকর্ডটিও অর্জন করেন। ইংলিশ ক্রিকেটে অধিনায়ক হিসেবে সর্বোচ্চ রান করা ব্যাটসম্যানে পরিণত হন তিনি। অধিনায়ক হয়ে ৫৯ ম্যাচে ৪৬.৫৭ গড় নিয়ে ৪৮৪৪ রান করেন তিনি। অধিনায়ক হিসেবে কুকের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো ২০১৩ ও ২০১৫ সালে অ্যাশেজ সিরিজ জয়। একইসঙ্গে ১৯৮৪-৮৫ সালের পর প্রথমবার ভারতের মাটিতে ভারতের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের সিরিজ জয়ের মতো বড় অর্জনের মাইলফলকও পার করেন কুক। তাছাড়া, ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান (১১৬৯৮) করার এবং এশিয়ার মাটিতে অভ্যাগত ব্যাটসম্যান হিসেবে সর্বোচ্চ রান (২৭১০) করার রেকর্ডধারীও কুক।
কুকের রেকর্ডের ফিরিস্তি শেষ করতেই হাঁপিয়ে উঠতে হয়। এমন এক ব্যাটসম্যানের হঠাৎ অবসর গ্রহণে অনেকেই একটু অবাক হয়েছেন। তবে, একজন ওপেনিং ব্যাটসম্যানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এটা সঠিকরূপে নিরূপণ করা যে, কখন শট খেলতে হবে আর কখন খেলতে হবে না। একইভাবে, কখন খেলা চালিয়ে যেতে হবে, আর কখন অবসর গ্রহণ করতে হবে, সে সিদ্ধান্তেও প্রজ্ঞার পরিচয় দেখিয়েছেন কুক। তার ব্যাটিং প্রদর্শনের অবনতি ধীরগতিসম্পন্ন হলেও পরিষ্কার লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। ২০১৮ সালের আগ পর্যন্ত কোনো বছরই কুকের ব্যাটিং গড় ৩২ এর কম ছিল না। কিন্তু এ বছর ব্যাটিং গড় ১৯-এর কোঠার ঊর্ধ্বে যাচ্ছিল না কোনোমতেই। যে ক্রিকেটার তার ক্যারিয়ারের সাফল্য স্বীয় উন্নতির প্রতি প্রগাঢ় নিষ্ঠা ও নিবেদনের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছেন তার জন্য প্রত্যেকটি ম্যাচের ব্যর্থতাই গভীর ক্ষত হিসেবেই উঠে আসবে। ইংলিশ ক্রিকেটের দানব এ বছর অনেক ঋজু হয়ে পড়ছিলেন।
ইংলিশ ক্রিকেটে অন্যান্য কিংবদন্তির সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে অনেকে বলেন, কুকের সৌভাগ্য যে তিনি এমন সময় ক্রিকেট মাঠে নেমেছিলেন যখন ইংল্যান্ড দল অন্যান্য যুগের চেয়ে অধিক সংখ্যক টেস্ট ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়। এমন এক সময়ে কুক ক্রিকেট খেলেছেন যখন উইকেটগুলো ছিল ব্যাটসম্যান সহায়ক এবং ৭০ ও ৮০ দশকের মতো বিধ্বংসী ফাস্ট বোলারদের অভাব প্রতি ক্রিকেট ম্যাচেই পরিলক্ষিত ছিল। কুকের উপরোল্লিখিত সাফল্যগুলো লক্ষ্য করলে এই যুক্তি ধোপে টেকে না। তবে, গোঁড়া সমালোচকদের সঙ্গে বিতর্ক করা এক অর্থে কুতর্কে জড়ানোই বৈকি।
কুক তার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই অত্যন্ত দক্ষ ও বিজ্ঞ পৃষ্ঠপোষকদের সহায়তা পেয়েছেন। তার কাউন্টি ক্রিকেট দল এসেক্সে গ্রাহাম গুচ এবং ইংল্যান্ড দলে এন্ড্রু স্ট্রস ও মাইকেল ভনের সহায়তা পেয়েছেন। ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত তিনি আধুনিক ক্রিকেটের আরও কয়েকটি দানবের সঙ্গে খেলার সুযোগ পান। যেমন, কেভিন পিটারসেন, জনাথন ট্রট, জেমস্ এন্ডারসন এবং স্টুয়ার্ট ব্রড। এসব খেলোয়াড়দের অর্জন, প্রদর্শন সবই ইংলিশ দলের সামগ্রিক সাফল্যে বিশাল প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে। যার ফলে ইংলিশ দল এ যাবৎকালের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হয়েছে। এই সফল ও প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের মাঝে থেকেও এ্যালিস্টার কুকের প্রতিভা ও অর্জন বিশ্বক্রিকেট এবং ইংলিশ ক্রিকেটে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।
ইংল্যান্ড কুকের মতো একজন খেলোয়াড়কে হারাতে চাইবে না। কিন্তু কুক যে তার সিদ্ধান্তে অটল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। লাল রঙের বলে টেস্ট ক্রিকেট খেলা সর্বশেষ কিংবদন্তিদের একজন তিনি। টি২০ ক্রিকেটের আবির্ভাবে আপামর ক্রিকেটের বিবর্তন পূর্ববর্তী কিংবদন্তি এ্যালিস্টার কুক। এমন একজন খেলোয়াড়কে, এমন নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যানকে হারানোর ক্ষতি পূরণে ইংল্যান্ডকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হবে। কিন্তু ক্রিকেটের সহজাত নিয়মেই কুকের বদলি খেলোয়াড় দলে জায়গা করেই নিবে। কুকের গড়া রেকর্ড গাথার ওপর ধীরে ধীরে ধুলো জমতে শুরু করবে। ক্রিকেটের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো তার অর্জনকে যথার্থ গুরুত্ব ও সম্মানও প্রদর্শন করবে না। কিন্তু ক্রিকেটার কুকের অর্জনকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ইংল্যান্ড ও বিশ্বক্রিকেটে কুকের অবদানের কথা যারা জানেন, যারা দেখেছেন, যারা উপভোগ করেছেন, তারা চিরদিনই মনে রাখবেন এ্যালিস্টার কুকের নাম।
যখন লেখাটি লিখছি তখন এ্যালিস্টার কুকের সর্বশেষ টেস্টের প্রথম দিন শেষ হয়েছে কেবল। ৭১ রান করে আউট হয়েছেন কুক। দ্বিতীয় ইনিংসে কুক আরেকটি সেঞ্চুরি করে  ১২ বছরের এক অসাধারণ ক্যারিয়ারের কাব্যিক ইতি টানবেন বলেই আশা করছে সবাই। ভারতের বিপক্ষেই টেস্ট অভিষেক হয়েছিল তার। প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে প্রতিপক্ষের হাত থেকে ম্যাচ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। চলতি টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসেও অভিষেক টেস্টের পুনরাবৃত্তি হলে ক্যারিয়ারের ইতি ও সামগ্রিক অর্জন ভিন্ন একমাত্রা পাবে। একইসঙ্গে সমাপনী টেস্ট ম্যাচে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে এ্যালিস্টার কুক জ্যাক ক্যালিস, সাঈদ আনোয়ার ও অরবিন্দ ডি সিলভার মতো কিংবদন্তিদের কাতারে যোগ দিবেন। ক্রিকেটের প্রতিষ্ঠিত কিংবদন্তির যথোচিত বিদায় যেন হয়, সেটাই প্রত্যাশা।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

খেলা
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.