সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন -আনিস রায়হান

Print Friendly and PDF

সদ্যই জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮। সাংবাদিকরা মনে করেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মুক্ত সংবাদমাধ্যমের পরিপন্থী, বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধী এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে বিরোধাত্মক। সরকার বলছে, এই আইনে সাংবাদিকদের ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অপরাধী মনে না হলে এত উদ্বেগের কী আছে। তারা বলতে চাইছেন যে, এটা কেবল অপরাধীদেরই শনাক্ত করবে ও তাদের শাস্তি দেবে। কিন্তু ২০০৬ সালে প্রণীত তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাসহ এর নিবর্তনমূলক বিভিন্ন ধারা নিয়ে যখন সাংবাদিকরা আপত্তি তুলেছিলেন, তখনও সরকার একই দাবি করেছিলেন। কিন্তু পরে দেখা গেল, এই আইনে একের পর এক সাংবাদিকদের জেলে পোরা হয়েছে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকার ওই আইনের ৫৭ ধারা বিলুপ্তির ঘোষণা দেয়। কিন্তু প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারাগুলো দেখেই সবাই বুঝতে পারে, ৫৭ ধারাভুক্ত সকল ব্যাপারাদি তো রয়েছেই, নতুন আইনে আরও অনেক বেশি দমনমূলক বিধান রাখা হয়েছে।
এমনভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়েছে যে, এটি প্রয়োগ হলে পুলিশ যখন তখন যেকোনো সাংবাদিককে জিজ্ঞাসা, দেহ তল্লাশি বা গ্রেপ্তার করতে পারবে। এমনকি এই আইনের মাধ্যমে সংবাদপত্রের কার্যক্রমও বন্ধ করে দিতে পারবে তারা। গেজেট প্রকাশের পর দেখা যায় প্রচ্ছদ, ভূমিকা ও গর্ভ মিলিয়ে পুরো আইনের পরিধি মাত্র ২৪ পৃষ্ঠা। কিন্তু তার মধ্যে অন্তত ৯ পৃষ্ঠাই হলো শাস্তি বা দ- সংক্রান্ত। যা কিনা আইনটির মূল উদ্দেশ্যকে প্রতিফলিত করে।
আইনটি কেবল সাংবাদিক নয়, ইন্টারনেটে লেখালেখি করেন এমন সকল নাগরিকের অধিকার সীমিত করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ আইনের ভাষা, বিচারের পদ্ধতিসহ অনেক কিছুই অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য। এটি হওয়ার কথা ছিল সাইবার নিরাপত্তা আইন। কিন্তু সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে এর নামকরণে ডিজিটাল শব্দটি আরোপ করা হয়েছে। ২০০১ সালের টেলিকমিউনিকেশন আইন এবং ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইন থাকা সত্ত্বেও একই বিষয়ে সরকার তৃতীয় এই আইনটি পাস করেছে।
কম্পিউটার হ্যাকিংসহ কিছু সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশে একটি আইনের প্রয়োজন ছিল, এটা সকলেই স্বীকার করে। প্রায়শই এরকম খবর আসে যে, ইন্টারনেট ডিভাইসে ম্যালওয়্যার বা ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, তথ্য হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে, অথবা ওয়েবসাইটই দখল করে নেয়া হচ্ছে। আবার অনলাইনে নারীর বিরুদ্ধে কুৎসা, বিকৃত ছবি প্রচার করার অভিযোগও বহুবার পাওয়া গেছে। স্বাভাবিকভাবেই তাই দাবি ছিল, এ সমস্ত ন্যক্কারজনক কর্মকা- ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনগত দিক নির্দেশনা প্রয়োজন। আইসিটি আইনের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো বাতিল করে, এ ধরনের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে সেটা সহজেই করা যেত। দেশবাসী এটাকে অভিনন্দন জানাতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু সাইবার অপরাধ রোধে সরকার আরও একটি নতুন পূর্ণাঙ্গ আইনের দিকে এগোলো এবং দেখা গেল তা করতে গিয়ে এই আইনের মাধ্যমে সব ধরনের মতপ্রকাশের সুযোগকে শর্তাধীন বা তাদের ইচ্ছাধীন করে ফেলেছে। তাই অভিযোগ উঠেছে, আইনটি তার সংজ্ঞায়িত পরিধি থেকে অনেক দূর ছাড়িয়ে গিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার পরিধির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এই আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রকৃতির পরিপন্থী এবং তা অনুশীলনের প্রতিকূল, যে সাংবাদিকতা জনগণের জানার অধিকার সুরক্ষা করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি জনসমক্ষে উন্মোচন করে। আইনটির ত্রুটিপূর্ণ ধারাগুলো একে একে বিশ্লেষণ করা গেলে বোঝা যাবে যে, আসলে কেন এই আইন!

২.

আইনটিতে উল্লেখ রয়েছে যে, এটির তদারকি সংস্থা হিসেবে কাজ করবে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সি’ নামক একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। যার কেন্দ্র ঢাকায় হলেও ঢাকার বাইরেও শাখা স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। এজেন্সির মহাপরিচালক হবেন এর প্রধান। এজেন্সিকে নির্দেশনা দেবে জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিল। এই কাউন্সিলের চেয়ারম্যান স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী।
এই আইনের ধারা ৯ অনুযায়ী, তাৎক্ষণিক ডিজিটাল হুমকি মোকাবিলায় মহাপরিচালকের অধীনে গঠিত ‘জাতীয় কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম’ নামক একটি ইউনিট থাকবে। যার সদস্য হবেন ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এই টিমের আকার তথা এর সদস্য সংখ্যা কত হবে তা আইনে উল্লেখ নেই। এছাড়া সরকার ঘোষিত ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’র প্রয়োজনে তার নিজস্ব ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন করতে পারবে। এজেন্সি এগুলোর সমন্বয় করবে। ধারা ১৬ অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর জন্য কোনো ব্যক্তির কার্যক্রমকে হুমকি মনে হলে এজেন্সির মহাপরিচালক স্বপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চালাতে পারবেন।
এর অর্থ দাঁড়ায়, এই আইনের অধীনে তথ্য-প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক নজরদারি চলবে। কারণ এসব ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিমের কাজ হবে সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধ করা ও হামলা হলে তা মোকাবিলা করা। সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধ করতে হলে তাদের অবশ্যই ব্যাপক নজরদারি চালাতে হবে। আর টিমের মধ্যে যেহেতু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকছে, তাতে এই আশঙ্কা অমূলক নয় যে, এই ধারার ফলে অনলাইনে নাগরিকদের ব্যক্তিগত কর্মকা- ও চিন্তাচর্চায় পুলিশি হস্তক্ষেপ বেড়ে যেতে পারে।

৩.
ধারা ৮(১) অনুযায়ী, এজেন্সির মহাপরিচালক তথা সরকার কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যদি ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্তকে ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি বিবেচনা করেন, তাহলে তিনি ওই তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) অনুরোধ করতে পারবেন।
ধারা ৮(২) অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যদি ডিজিটাল মাধ্যমের কোনো তথ্য-উপাত্তকে ‘দেশের বা উহার কোনো অংশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকা-, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণœ করে, বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঞ্চার করে’ বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে তারাও ওই কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিটিআরসিকে ওই তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার জন্য অনুরোধ করতে পারবেন।
আগের দুই ধারায় যাকে ‘অনুরোধ’ বলা হয়েছে, ধারা ৮(৩) বলছে, সেটা আসলে মানতে বাধ্য এমন এক নির্দেশ। এই ধারা অনুযায়ী, ‘কোনো অনুরোধ প্রাপ্ত হইলে বিটিআরসি উক্ত বিষয়াদি সরকারকে অবহিতক্রমে, তাৎক্ষণিকভাবে উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমতো ব্লক করিবে।’
অর্থাৎ শুরুতে যদিও অনুরোধের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এই অনুরোধে সাড়া না দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। সে হিসাবে ওই ‘অনুরোধ’ আসলে নির্দেশ বলেই গণ্য হবে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, ধারা ৮-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা এজেন্সি চাইলেই তাদের কাছে ডিজিটাল নিরাপত্তার হুমকি বিবেচিত যেকোনো তথ্য-উপাত্ত ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে বা ব্লক করে দিতে পারবেন। এখানে আশঙ্কার জায়গাটা হলো, সরকারবিরোধী যৌক্তিক প্রচারণা, বক্তব্য বা সংবাদ হুমকি বিবেচিত হতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর আচরণ বিষয়ক মন্তব্য বা সংবাদ এর মধ্যে পড়তে পারে। ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠদের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের যেকোনো বক্তব্য এর মধ্যে পড়তে পারে। আদিবাসী অধিকার আন্দোলন থেকে প্রচারিত বক্তব্য, বিবৃতি এই খড়গের শিকার হতে পারে।
সার্বিকভাবে এই আইনে ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচিত যেকোনো তথ্য-উপাত্তই ব্লকের শিকার হতে পারে। আর সেটা হুমকি নাকি হুমকি নয় তা নির্ধারণের একক এক্তিয়ার সরকার তথা এজেন্সি মহাপরিচালক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এটা এই আইনের অন্যতম ভয়াবহ দিক। যার মাধ্যমে পুলিশ ও সরকার যেকোনো বিরোধীমতকে দমনের অবাধ সুযোগ পাচ্ছে। ব্লক করার এই ক্ষমতা দেয়ার ক্ষেত্রে কোথাও ব্যাখ্যা করা হয়নি যে, কোথায় ব্লক করা যাবে, আর কোথায় যাবে না। যদিও কোনো কনটেন্ট ব্লক করাটা আসলে তথ্যকে বিলুপ্ত করা, এক্ষেত্রে আদালতের ভূমিকা কী হবে তাও উল্লেখ নেই।

৪.
ধারা ২১ অনুযায়ী, ‘মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালালে বা তাতে মদদ দিলে ১৪ বছর কারাদ- বা ১ কোটি টাকা জরিমানা হতে পারে, কিংবা উভয় দ- একইসঙ্গে দিতে পারবেন আদালত। একই কাজ আবার করলে যাবজ্জীবন ও/বা ৩ কোটি টাকা জরিমানা হতে পারে।
আইনের এমন ধারার ফলে একাত্তরের ইতিহাসের যেসব অধ্যায় এখনও আড়ালে আছে, তা উন্মোচনের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনাবলি ঘিরে রাজনৈতিক মহলের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। ‘মুক্তি’ একটি রাজনৈতিক প্রত্যয় হওয়ায় একেকটি রাজনৈতিক দলের কাছে মুক্তি একেক রকম। এর কোনো সার্বজনীন সংজ্ঞা হয় না। ফলে যুদ্ধে কার মুক্তি এসেছে, কার মুক্তি আসেনি, এসব বিষয়ে ভিন্নমত থাকাই স্বাভাবিক। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কোনো সার্বজনীন সংজ্ঞা দেয়া যায় না। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই ধারার ফলে বর্তমান সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধের আওয়ামী ভাষ্যের বাইরের মতগুলো দমনের শিকার হবে। তেমনি এই সরকারের পরে যখন বিপরীত ধারার কোনো সরকার আসবে, তারাও এটি ব্যবহার করে পাল্টা মতগুলোকে দমন করার সুযোগ পাবে।
ধারা ২৮ অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইন্টারনেটে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করে বা করায়, যা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত করে, তাহলে সেই ব্যক্তিকে ৭ বছর কারাদ- বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে, কিংবা উভয় দ- একইসঙ্গে দিতে পারবেন আদালত। একই কাজ আবার করলে ১০ বছর ও/বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
ধর্মীয় মূল্যবোধ ব্যাপারটা খুবই অনির্দিষ্ট। ধর্মের নামে সমাজে প্রভাব বিস্তার করা, অপরাধ করার মতো যেসব ব্যাপার আছে, এই আইনের ফলে সেসব নিয়ে অনলাইনে মন্তব্য করা, লেখা বা সংবাদ প্রকাশ করার সুযোগ থাকবে না। ফতোয়ার মতো ব্যাপারগুলো প্রতিরোধ করা যাবে না। তাছাড়া এই ধারাটির কারণে জ্ঞানচর্চা সংকটে পড়ে যাবে।

৫.
ধারা ২৫ অনুযায়ী, আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ বা প্রকাশ করলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণœ করা, বিভ্রান্তি ছড়ানো, অপপ্রচার বা মিথ্যা তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করলে বা করতে সহায়তা করলে, কিংবা কাউকে অসৎ বা নীতিভ্রষ্ট করতে পারে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করলে সেজন্য ৩ বছর কারাদ- বা ৩ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে, কিংবা উভয় দ- একইসঙ্গে দিতে পারবেন আদালত। একই কাজ আবার করলে ৫ বছর ও/বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
এটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার। অনলাইনে, ই-মেইলে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহারে অনেকেই তথ্য আদান প্রদান করে থাকেন। বন্ধুকে পাঠানো বার্তায় তারা নানা ধরনের তথ্য-উপাত্ত যুক্ত করেন। এতে ছবি, খবরসহ আরও অনেক কিছু থাকে। বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে গেলে পরে এসব উপকরণকে ‘আক্রমণাত্মক তথ্য প্রেরণ বা ভীতি প্রদর্শক তথ্য প্রেরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় বিরোধীকেও ফাঁদে ফেলা সম্ভব।
কাউকে অসৎ বা নীতিভ্রষ্ট করতে পারে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করলে এই ধারার আওতায় তাকে অপরাধ গণ্য করা হয়েছে। এটা খুবই সমস্যাজনক একতা ধারা। যে নারী তার অধিকারের পক্ষে লড়াই করেন, তিনি সামাজিক যেসব শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তা কোনো কোনো নারীর কাছে ‘নীতিভ্রষ্ট’তা হিসেবে গণ্য হতে পারে। এটা এমনকি পোশাকের ক্ষেত্রে, জীবনাচরণের ক্ষেত্রেও প্রযুক্ত হবে। কারও সাধারণ একটি ছবিতেও অন্য কেউ মনে করতে পারেন যে, তাকে নীতিভ্রষ্ট করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। কেউ হাস্যরসের ছলে (সারকাজম) কোনো কথাবার্তা লিখলে তা অসৎ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে বলে গণ্য হতে পারে। কারও ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি, কাজ অন্যের কাছে এরকম মনে হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে মানুষ যেহেতু এখন ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কিছুই প্রকাশ করছেন, ফলে এই ধারাটি বড় ধরনের সংকটের কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিরোধীকে হয়রানির ক্ষেত্রে এর অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। কারণ ঠিক কী করলে তা অসৎ বা নীতিভ্রষ্ট গণ্য হবে তা আইনে উল্লেখ করে দেয়া হয়নি।
এ সম্পর্কে সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তারা বলেছেন, এই ধারা সংবাদমাধ্যমে সব ধরনের অনুসন্ধানী রিপোর্টিংকে সরাসরি বিরূপভাবে প্রভাবিত করবে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনিয়মসংক্রান্ত ঘটনা নিয়েই এ ধরনের প্রতিবেদন করা হয়ে থাকে। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সাংবাদিক ও সংবাদপ্রতিষ্ঠানকে ভয় দেখাতে এই আইন ব্যবহার করতে পারেন। তারা এই অজুহাত দেখিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন যে ওই প্রতিবেদনে তাদের আক্রমণ করা বা হুমকি দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের সব প্রতিবেদনই উল্লিখিত এক বা একাধিক বিধানের আওতায় পড়ে বলে মন্তব্য করা হতে পারে এবং সংবাদমাধ্যমকে হয়রানির কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি উন্মোচন করে, এমন যেকোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘বিরক্তিকর’, ‘বিব্রতকর’ বা ‘অপমানজনক’ হতে পারে। এই বিধান কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ অসম্ভব করে তুলবে। এটি সংবাদপত্রকে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানে পর্যবসিত করবে। এমনকি সাংবাদিকতার সাধারণ অনুসন্ধানও অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এতে ‘বিভ্রান্তি ছড়ানো’র কথা বলা হয়েছে। বিভ্রান্তি ছড়ানো বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করা না হলে এই ধারা সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের হয়রানি করার হাতিয়ারে পরিণত হবে। একজনের কাছে যা বিভ্রান্তিমূলক, আরেকজনের কাছে তা না-ও হতে পারে। সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই নতুন একটি পথ তৈরি করবে।
রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি ও সুনাম’ ক্ষুণœ করা বলতে কী বোঝায়? সম্প্রতি আমরা ব্যাংক খাতে বিভিন্ন বিবেকহীন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর দুর্নীতির খবর পরিবেশন করেছি। সেসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা জনগণকে জানিয়েছি যে, ব্যাংক খাত গুরুতর সংকটে পড়েছে। এতে কি ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণœ হয়েছে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে দুর্নীতি নিয়ে আমরা সংবাদ পরিবেশন করেছি। আমরা ‘হেফাজতে মৃত্যু’, ‘গুম’ ও ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছি। কেউ যদি ব্যাখ্যা করেন যে এসব প্রতিবেদন রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণœ করেছে, তাহলে এই আইন এ ধরনের সংবাদ পরিবেশন করায় সাংবাদিক ও সংবাদপত্রগুলোকে শাস্তি দেওয়ার বৈধতা দেয়। কারণ, প্রায় সব সংবাদপত্রেরই নিজস্ব ওয়েবসাইট ও অনলাইন পোর্টাল রয়েছে।
সাংবাদিকতার জন্য সবচেয়ে বিরূপ হলো ধারা ৩২। এই ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গ করেন, অর্থাৎ সরকারি এমন কোনো দলিল, ছবি বা তথ্য, যা সরকার প্রকাশ করেনি, তেমন কিছু যদি অনলাইনে প্রকাশ করেন বা এ কাজে কেউ তাকে সহযোগিতা করেন তাহলে তিনি ১৪ (চৌদ্দ) বছর কারাদ-, বা ২৫ লাখ টাকা অর্থদ-, বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। একই অপরাধ আবার করলে যাবজ্জীবন কারাদ-ে বা ১ কোটি টাকা অর্থদ-ে, বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন।
সাংবাদিকদের কাজই হলো সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা জনগণের সামনে প্রকাশ করা। সরকার প্রকাশের আগেই সাংবাদিকরা সেগুলো জনগণের সামনে আনেন। এখন এ ধরনের কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ও তার পত্রিকা সংশ্লিষ্ট সকলকেই এ ধরনের সংবাদ প্রকাশে সহযোগিতার জন্য দ-িত করা যাবে। সব পত্রিকারই ওয়েবসাইট রয়েছে, ফলে সমস্ত সংবাদ মাধ্যম এই খড়গের মধ্যে পড়ে যাবে।
এ প্রসঙ্গে সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য ছিল, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ঔপনিবেশিক আমলের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণমূলক আইন, যা ব্রিটিশ প্রশাসনকে সব ধরনের জবাবদিহি থেকে রক্ষা করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছিল। আমরা মর্মাহত হয়ে সেটিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে টেনে আনতে দেখলাম। সরকার যা প্রকাশ করে না, তা-ই ‘সরকারি গোপন তথ্য’ বলে বিবেচিত হতে পারে। একটি উদাহরণ দিই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ব্যাংক খাতের অনিয়ম সম্পর্কে কয়েক ডজন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। বলা হতে পারে, এ ধরনের সব প্রতিবেদনই অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট লঙ্ঘন করেছে। প্রকাশ করা হয়নি, এমন সব সরকারি প্রতিবেদনই অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় পড়ে, এমনকি পরিবেশদূষণ বা শিশুপুষ্টি নিয়ে সরকারি প্রতিবেদন ইত্যাদিও। এ ধরনের কোনো তথ্য ছাড়া কি অর্থপূর্ণ সাংবাদিকতা সম্ভব? আর যেখানে তথ্য অধিকার আইনের বলে জনগণের ‘জানার অধিকার’ রয়েছে বিশেষত যখন এ ধরনের সব প্রতিবেদন তৈরি করা হয় জনগণের অর্থ ব্যয় করেÑ সেখানে এসব প্রতিবেদন সাংবাদিকতার কাজে ব্যবহার করা কেন ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হবে?
বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারি দপ্তরের অপ্রকাশিত প্রতিবেদন ছাড়া ফারমার্স বা বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বা ব্যাপক অনিয়ম নিয়ে কি আমরা কোনো প্রতিবেদন তৈরি করতে পারতাম? আমাদের প্রতিবেদকের হরহামেশাই মোবাইল ফোনে এ ধরনের দলিলের ছবি তুলতে হয়। কাজেই তাদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া যেতে পারে, তাই তো?

৬.
যেকোনো ব্যক্তির জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিধান হলো ধারা ৪৩। এতে পুলিশকে যেকোনো জায়গায় প্রবেশ, যেকোনো কম্পিউটার ব্যবস্থায় তল্লাশি চালানো, যেকোনো কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও সার্ভার জব্দ করা, যেকোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি এবং শুধু সন্দেহবশত যে কাউকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
৪৩ ধারায় বলা হয়েছে, ‘(১) যদি কোনো পুলিশ অফিসারের এইরূপ বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে কোনো স্থানে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে বা হইতেছে বা হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে বা সাক্ষ্য প্রমাণাদি হারানো, নষ্ট হওয়া, মুছিয়া ফেলা, পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপায়ে দুষ্প্রাপ্য হইবার বা করিবার সম্ভাবনা রহিয়াছে, তাহা হইলে তিনি অনুরূপ বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া মহাপরিচালকের অনুমোদনক্রমে নিম্নবর্ণিত কার্য সম্পাদন করিতে পারিবেন,
(ক) উক্ত স্থানে প্রবেশ করিয়া তল্লাশি এবং প্রবেশ বাধাপ্রাপ্ত হইলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ;
(খ) উক্ত স্থানে তল্লাশিকালে প্রাপ্ত অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার্য কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, তথ্য-উপাত্ত বা অন্যান্য সরঞ্জামাদি এবং অপরাধ প্রমাণে সহায়ক কোনো দলিল জব্দকরণ;
(গ) উক্ত স্থানে উপস্থাপিত যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি;
(ঘ) উক্ত স্থানে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ করিয়াছেন বা করিতেছেন বলিয়া সন্দেহ হইলে উক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার।’
সম্পাদক পরিষদ মনে করে, পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তারের হুমকি স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে বাধার সৃষ্টি করবে। পুলিশ যখন স্রেফ সন্দেহবশত ও পরোয়ানা ছাড়াই সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা পাবে, তখন এই আইনের ছায়াতলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কবর রচিত হবে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকতার সব পন্থা বাধাগ্রস্ত হবে। আমাদের সংবাদমাধ্যম নিছকই জনসংযোগ কর্মকা- ও প্রচারণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এমনকি সাংবাদিকদের ওপর এ আইনের প্রয়োগ না হলেও (আইন থাকলে প্রয়োগ হবেই না বা কেন?) ভীতির পরিবেশে তারা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা অনুভব করবেন। গ্রেপ্তার-আতঙ্ক তাদের ‘মানসিক পরিবেশের’ এক প্রাত্যহিক অংশ হয়ে উঠবে। প্রতিবেদন তৈরির কাজে তারা নিয়মিত যেসব সংগত ঝুঁকি নিয়ে থাকেন, এই ভীতির কারণে সেসব ঝুঁকি নিতে তারা আর সাহস পাবেন না। খুব সহজেই ধরে নেওয়া যায় যে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা এ আইনের অপব্যবহার করবেন। ধনী ও ক্ষমতাসীনেরা গোপন রাখতে চান, এমন বিষয়ে যেকোনো সংবাদ প্রতিবেদনের জন্য সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে হুমকি দিতে, এমনকি গ্রেপ্তার করতে তারা আইন প্রয়োগকারীদের প্ররোচিত বা ‘হাত করতে’ পারেন।
এ আইনের আরও বিপজ্জনক দিক হলো, সব সংবাদপত্র ও টেলিভিশন স্টেশনই এখন ডিজিটাল ব্যবস্থায় কাজ করে বলে কম্পিউটার, সার্ভারসহ কম্পিউটার নেটওয়ার্ক জব্দ করার ক্ষমতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দেওয়ার মাধ্যমে কার্যত তাদের যেকোনো সংবাদপত্র, টিভি স্টেশন বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি জব্দ করলে তার কার্যক্রম থেমে যেতে পারে। এভাবে কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক বন্ধ না করেই আইনের এই ধারায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর হাতে সংবাদপত্রের প্রকাশনা বা কোনো টিভি স্টেশনের কার্যক্রম রুদ্ধ করে দেওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

৭.
উদ্বেগের আরও একটি বিষয় হলো, এ আইনের অপরাধ ও শাস্তিসংক্রান্ত প্রায় ২০টি ধারার মধ্যে ১৪টি জামিন অযোগ্য, ৫টি জামিনযোগ্য এবং একটি সমঝোতাসাপেক্ষ। ন্যূনতম শাস্তির মেয়াদ করা হয়েছে ১ বছর কারাদ-, সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ-। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাস্তির মেয়াদ ৪ থেকে ৭ বছর কারাদ-। এর ফলে অনিবার্যভাবে একটা ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যেখানে সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অনুশীলন অসম্ভব না হলেও হয়ে উঠবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
সরকার কিছুদিন আগে সড়ক নিরাপত্তা আইন পাস করেছে। তাতে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মেরে ফেলার সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ বছরের কারাদ-। একই সময়ে পাস করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। তাতে আইনি ক্ষমতা বা ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো ব্যক্তির নাম, ঠিকানা, ছবি তথা ‘পরিচিতি তথ্য’ সংগ্রহের জন্যও শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে ন্যূনতম ৫ বছরের কারাদ-। এটা পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দেয় যে, আইনটির শাস্তির বিধান একেবারেই নিবর্তনমূলক এবং ত্রুটিপূর্ণ।
নতুন কোনো আইন হলে আইনজ্ঞরা দেখেন সংবিধানের সঙ্গতিপূর্ণ আইন হলো কিনা। বিশেষজ্ঞরা দেখেন প্রস্তাবিত আইনটি সংশ্লিষ্ট খাতের সমস্যা মোকাবিলা করতে পারবে কিনা। কিন্তু আমাদের দেশে পরিস্থিতি এমন যে, নতুন কোনো আইন হলে সবাই আশঙ্কায় থাকেন, এটা বিদ্যমান হতাশাজনক মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরও সংকুচিত করে ফেলবে কিনা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এক্ষেত্রে নতুন কোনো পথ দেখাতে পারেনি। ব্যাখ্যাহীন নানা শব্দ ও শব্দবন্ধ প্রবেশ করিয়ে আগের মতো এই আইনেরও যথাযথ ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। ৫৭ ধারার ভয়ঙ্কর উপাদানগুলো প্রায় সবই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এই আইনটি হয়ে উঠেছে তার চেয়েও বেশি কিছু।
স্বাভাবিকভাবেই নতুন আইনটি দ্বারা সাংবাদিক ও অনলাইনে মতপ্রকাশকারী নাগরিকদের সারাক্ষণ এক ধরনের গ্রেপ্তার আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হবে। অতীতের ঘটনাবলি আমলে নিলে বলা যায়, ৫৭ ধারার মতো এই আইনের বিরুদ্ধেও ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে সাংবাদিকরা এই আইন নিয়ে যথেষ্ট সোচ্চার। এটা সংবাদমাধ্যম ও রাষ্ট্রকে মুখোমুখি করে ফেলবে। সরকারের উচিত হবে, দ্রুতই আইনটি বাতিল করা এবং মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপমূলক ধারাগুলো বাদ দিয়ে নতুন করে সকলের মতামতের প্রেক্ষিতে সাইবার নিরাপত্তার জন্য উপযোগী ও গণবান্ধব একটি আইন প্রণয়ন করা।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

বিশ্লেষন
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.