ভারসাম্য বজায় রাখার কূটনীতি -সাইমন মোহসিন

Print Friendly and PDF

গত সেপ্টেম্বর মাসব্যাপী ভারতের কূটনীতির ওপর প্রচ- চাপ গিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বনাম রাশিয়ার মধ্যকার টানাপড়েনের শিকার ভারতকে এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে অনেক আলোচনা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিতে হয়েছে। এক কথায় ভারতীয় কূটনৈতিক প্রজ্ঞা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছে গত মাসে। তারই চূড়ান্ত পরীক্ষা যেন অনুষ্ঠিত হলো যখন রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ভারত সফর করেন। পুতিন ও মোদির বৈঠকের মধ্যে ভারত-রাশিয়া শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় অক্টোবরের ৫ তারিখ। এই বৈঠকেই ভারত ও রাশিয়া ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিমাণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত রাশিয়ার বহুল আলোচিত এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা পদ্ধতি ক্রয় করা নিশ্চিত করেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত যেন পরিষ্কার করেই বলে দিল যে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পড়ে ভারত-রাশিয়ার সম্পর্কে কোনো ছেদ হবে না। বৈশ্বিকমঞ্চে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে ভারত চলবে, এ কথা ভারত পরিষ্কার করে জানিয়ে দিল।
পুতিন-মোদি শীর্ষ সম্মেলনে ভারত-রাশিয়া আরও আটটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর মধ্যে একটি ছিল ভারতের মহাকাশ অভিযান পরিচালনায় রাশিয়ার সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি। তবে, এই আটটির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত কিংবা সমালোচিত হলো এস-৪০০ প্রতিরক্ষা পদ্ধতি ক্রয়ের চুক্তি। এই চুক্তি স্বাক্ষরের ঠিক আগেই যুক্তরাষ্ট্র সতর্কবাণী প্রকাশ করে। মাত্র গত সপ্তাহেই এই একই প্রযুক্তি ক্রয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। গত মাসের ২+২ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে পরিষ্কার করেই বলে যে, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সম্পর্ক সম্বন্ধে অবগত। এজন্য রাশিয়ার কাছ থেকে সচরাচর ক্রয় করা সরঞ্জামাদি ক্রয় করলে ভারতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হবে না। কিন্তু নতুন কোনো সরঞ্জাম বা প্রযুক্তি ক্রয় করলে সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন ও অপছন্দনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
মোদি-পুতিনের বৈঠকের আগের দিনই যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সকল মিত্রের প্রতি রাশিয়ার এস-৪০০ পদ্ধতি ক্রয়ের বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করেন। তিনি জানান, রাশিয়ার কাছ থেকে এই পদ্ধতি ক্রয় করলে ক্রেতা রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বারবার বলে আসছে যে, তার জারি করা নিষেধাজ্ঞাগুলো রাশিয়ার বিপক্ষে। কোনো মিত্র রাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করা এই নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য নয়।
কিন্তু রাশিয়া ভারতের সর্ববৃহৎ সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহকারী। এছাড়া, ভারত এখন ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে নিজ সামরিক সরঞ্জামাদি নবায়নের বিশাল কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এই কর্মসূচির অধিকাংশ সরঞ্জামাদি সরবরাহ করবে রাশিয়া।
কতিপয় বিশেষজ্ঞের মতে ভারতের জন্য পরিস্থিতিটা সোভিয়েত রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শীতল যুদ্ধকালীন সময় থেকেও জটিল। সে সময় ভারত জোটনিরেপক্ষতা (নন অ্যালাইড মুভমেন্ট) দাবি করলেও, ভারতের সমর্থন ছিল রাশিয়ার প্রতিই। আর যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের তালিকাবহির্ভূত ছিল ভারত।
এখন চীনের প্রভাব মোকাবিলা করতে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন। একইসঙ্গে ভারতের ব্যবসায়িক গোষ্ঠী তাদের বাণিজ্যিক ও ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই অগ্রাধিকার দিতে আগ্রহী। অন্যদিকে, রাশিয়া পুরনো বন্ধু। নির্ভরযোগ্য সামরিক অংশীদার। রাশিয়ার গ্যাস খাতেও ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে। একদিকে রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার ও সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের দরকার। বিশেষ করে যখন রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে ভারত খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। অন্যদিকে, ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্য রাশিয়ার কোনো বিকল্প নেই। ভারত রাশিয়ার সঙ্গে তার জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আগ্রহী।
পুতিন ভারতের সঙ্গে পারমাণবিক জ্বালানি শক্তি, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস, এমনকি ডায়মন্ড খাতে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছেন। ইউক্রেনের বিদ্রোহ ও ক্রিমিয়ার দখলের কারণে রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার অর্থনীতি চাপের মুখে। রাশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য নতুন বাজারের সন্ধানে ভারত অত্যন্ত লোভনীয় বাজার। সেক্ষেত্রে, রাশিয়ার জন্যও ভারত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত ও রাশিয়ার এমন পরস্পর নির্ভরশীল ও দীর্ঘ বন্ধুসুলভ সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতেই ভারত স্বাভাবিকভাবেই সচেষ্ট থাকবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এর জন্য সম্পর্কে সমস্যা দেখা দিবে। কিন্তু তাতেও পিছপা হচ্ছে না ভারত।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার সমস্যায় আটকে নিজ স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে রাজি নয় ভারত। এজন্য এই দুই গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। ভারতের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য এই দুই রাষ্ট্রের গুরুত্বই অপরিসীম। এজন্য এই দুই রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় ভারত। একের জন্য অপরকে বেছে নেয়ার কূটনীতি করতে আগ্রহী নয় মোদি সরকার। আর এজন্যই যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্রয় করেছে মোদি সরকার। এতে করে ভারতের কূটনৈতিক পরীক্ষা যেন আরও জটিল হয়ে পড়লো। ভারতের কূটনীতির জন্য পরবর্তী পরীক্ষা হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা হতে কিভাবে ছাড় পাওয়া যায় তার প্রচেষ্টা শুরু করা।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.