[পাঠক ভাবনা] সিনিয়র সিটিজেনদের সমস্যা কিছু সুপারিশ -মাহমুদ হোসেন

Print Friendly and PDF

গত ১ অক্টোবর অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক সিনিয়র সিটিজেন দিবস পালিত  হয়েছে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন র‌্যালি, আলোচনা সভা ইত্যাদির আয়োজন করেছে। জাতিসংঘ ১৯৯১ সালের ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সিনিয়র সিটিজেন দিবস (International Day of older Persons) ঘোষণা করেছে। ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সের ব্যক্তিগণকে সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে গণ্য করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়- ‘মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রবীণদের স্মরণ- শ্রদ্ধায়’। বাংলাদেশেও সিনিয়র সিটিজেন দিবস পালন করা হয় এবং  ৬০ ঊর্ধ্ব বয়সের নাগরিকগণকে সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে মর্যাদা প্রদান করা হয়। প্রবীণ জনগোষ্ঠী যাতে সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে পরিবার ও সমাজে বসবাস করতে পারেন এবং সামাজিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করতে পারেন, কারও অবহেলা বা অসম্মানের  স্বীকার না হন তা নিশ্চিত করা ও সচেতনতা সৃষ্টি করাই এই দিবসের উদ্দেশ্য।   
২০১৮ সালের পরিসংখ্যান মতে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ প্রবীণ জনগোষ্ঠী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে  ৮০% প্রবীণ কর্মহীন, পরমুখাপেক্ষী ও অনেক ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। এই প্রবীণ জনসংখ্যা ২০১৫ সালে ১ কোটি ৮০ লক্ষ এবং ২০৫০ সালে ৫ কোটিতে উন্নীত হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের ৮৮% প্রবীণ মানসিক নির্যাতন, ৮৩% অবহেলা ও  ৫৫% অর্থনৈতিক প্রবঞ্চনার স্বীকার। এ ছাড়া  ৮০% প্রবীণ কর্মহীন, পরমুখাপেক্ষী ও পরিবার-সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন।
ভারত, জাপান, সুইডেন, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে। ভারত ২০০৭ সালে আইন প্রণয়ন করে সিনিয়র সিটিজেনদের বিভিন্ন রকম সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে- সিনিয়র সিটিজেনদের জীবন ও সম্পদ সংরক্ষণ, জীবনযাপনের মূল চাহিদা পূরণ, সন্তান কর্তৃক পিতামাতার অবহেলায় শাস্তির বিধান, গণপরিবহন তথা- রেল, বিমান, বাস, লঞ্চ ইত্যাদিতে আসন সংরক্ষণ ও হ্রাসকৃত মূল্যে সেবা প্রদান,  ব্যাংক, হাসপাতালসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার ও হ্রাসকৃত মূল্যে সেবা প্রদান এবং বিভিন্ন জেলায় প্রবীণদের জন্য পৃথক হাসপাতাল ও প্রবীণ নিবাস স্থাপন।  
বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৮ সালে অসচ্ছল প্রবীণদের জন্য বয়স্কভাতা চালু করেছে। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৪০-৫০ লক্ষ প্রবীণ মাসিক ৫০০/- টাকা হারে বয়স্কভাতা পাচ্ছেন। এছাড়া সরকার ও প্রবীণ হিতৈষী সংঘ আগারগাঁওয়ে প্রবীণ নিবাস ও ৫০ শয্যা বিশিষ্ট প্রবীণ হাসপাতাল স্থাপন করেছে। বেসরকারি খাতে খতিব জাহিদ মুকুল  সম্পূর্ণ নিজ অর্থায়নে জয়দেবপুরে ১৫০০ প্রবীণের জন্য একটি প্রবীণ নিবাস স্থাপন করেছেন। তবে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার কর্তৃক উন্নত দেশের ন্যায় কল্যাণমুখী বিভিন্ন কার্যক্রম এখনও গ্রহণ করেনি। যার ফলে বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠী বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
ভারত ও উন্নত দেশসমূহের ন্যায় বাংলাদেশ সরকার দেশের ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে নিম্ন বর্ণিত সুযোগ-সুবিধা প্রদানের বিষয়ে বিবেচনা করতে পারে।
১। প্রবীণদের কল্যাণার্থে পৃথক মন্ত্রণালয় অথবা অধিদপ্তর গঠন। ২। বাংলাদেশের বিদ্যমান ২০১৩ সালের প্রবীণ আইন ও নীতিমালার সংস্কারপূর্বক মাতা-পিতার ভরণপোষণ নিশ্চিতকল্পে সময়োপযোগীকরণ। এছাড়া নতুন আইন প্রণয়নপূর্বক প্রবীণদের কল্যাণে বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থায় ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা।  ৩। গণপরিবহনে (ট্রেন, বাস, বিমান, লঞ্চ, স্টিমার) প্রবীণদের জন্য আসন সংরক্ষণ এবং অন্যান্য দেশের ন্যায় হ্রাসকৃত মূল্যে সেবা প্রদান। ৪। হাসপাতাল, ক্লিনিক, ফার্মেসি ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে প্রবীণদের অগ্রাধিকার প্রদান এবং হ্রাসকৃত মূল্যে সেবা প্রদান।  ৫। প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু করার ব্যবস্থা। ৬। জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্পসমূহে প্রবীণদের জন্য অপেক্ষাকৃত উচ্চহারে লাভ প্রদান। ৭। সরকারি বেসরকারি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সেবা প্রদানে প্রবীণদের  অগ্রাধিকার প্রদান তথা পৃথক কাউন্টার স্থাপন। ৮। প্রবীণ কল্যাণ ব্যাংক ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা। ৯। রাজধানী ও বিভাগীয় শহরে পর্যায়ক্রমে প্রবীণ নিবাস প্রতিষ্ঠা। ১০।  প্রবীণদের পরিচিতিমূলক পৃথক ন্যাশনাল আইডি কার্ড (সিনিয়র সিটিজেন কার্ড) প্রদান। ১১। ঢাকার আগারগাঁওয়ে সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত প্রবীণ নিবাস ও হাসপাতালের সম্প্রসারণ এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি। ১২। সরকারি বেসরকারি খাতে চাকরির মেয়াদ অন্তত ৬৫ বছরে উন্নীতকরণ। ১৩। প্রবীণদের তাঁদের পূর্ববর্তী সর্বশেষ কর্মস্থল/সংস্থায় বছরে একবার সংবর্ধনা প্রদান।  
আশা করি, সরকার উপরোক্ত সুপারিশমালার আলোকে প্রবীণ নাগরিকদের কল্যাণে ২০১৩ সালের বিদ্যমান আইন সময় উপযোগী সংস্কার সাধন করার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। তবে প্রবীণদের কল্যাণে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা উচিত তাঁদের সন্তান-সন্ততিদের। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছেলেমেয়ে পিতামাতাকে ভালোবাসে এবং তাঁদের ভরণপোষণ করে থাকে। কিছুসংখ্যক সন্তান পিতামাতাকে অবহেলা করে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয় যা মোটেই কাম্য নয়। আগামীতে তরুণ সমাজ তথা সকল সন্তান-সন্ততি পিতামাতাকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান দিয়ে পরিবারের সদস্য হিসেবে ভরণপোষণ করবে, এটাই প্রবীণ সমাজের প্রত্যাশা।  
লেখক : প্রবীণ কৃষিবিদ ও মহাব্যবস্থাপক (অব.) বিএডিসি

সাপ?তাহিক পতিবেদন

নিয়মিত বিভাগ
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.