[অন্যমত] শঙ্কা-আতঙ্কের নির্বাচন

Print Friendly and PDF

মযহারুল ইসলাম বাবলা

আসছে ডিসেম্বরেই অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনমনে নানা শঙ্কা-উদ্বেগ, আতঙ্ক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিদ্যমান নির্বাচন কমিশন এবং ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ থেকে নানা প্রশ্ন-বিরোধিতা ক্রমেই সরব হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে বাদ-প্রতিবাদ, উৎসাহ-উদ্দীপনা না থাকলেও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শঙ্কা-আতঙ্ক কিন্তু সর্বত্র বিরাজ করছে। নির্বাচনে কে ক্ষমতায় এলো-গেল এ নিয়ে ভাবনার অবকাশ সঙ্গতকারণেই সাধারণের নেই। নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতাই তাদের হতাশার চরম সীমায় পৌঁছে দিয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচনের মাধ্যমে এ যাবৎ জনগণের জীবন-মানের পরিবর্তনের একটিও নজির নেই। একাত্তরের বিজয়ী মুক্তিযুদ্ধই জাতির জীবন-মানের পরিবর্তন আনতে পারেনি। নির্বাচন তো ছাড়।
আমাদের দেশে নির্বাচন মাত্রই ছিল এক ধরনের উৎসব। নির্বাচনী উৎসব-উদ্দীপনায় সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে মাতামাতি দেখা যেত। প্রার্থীর অনুকূলে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় শামিল হলে চা-বিড়ি, নাস্তা জুটতো। নির্বাচনী উৎসবের নানা আকর্ষণেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নির্বাচনী উৎসবে উৎসাহ সহকারে যুক্ত হতো। পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে আবেগে নানামুখী নির্বাচনী প্রচারাভিযানে যুক্ত হতো। সেই উৎসব ক্রমেই এখন শঙ্কা-আতঙ্কে পর্যবসিত হয়েছে। কিন্তু কেন?
একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জনগণের ভোট প্রদানের অধিকার সাংবিধানিক। সেই অধিকার থেকেও যখন জনগণ বঞ্চিত হয় সেটা ফ্যাসিবাদী শাসনকেই নিশ্চিত করে। নব্বইর গণঅভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসানে মানুষ আশান্বিত হয়েছিল বটে, তবে সে আশাও দুরাশায় পরিণত হতে বিলম্ব করেনি। আমাদের শাসকেরা সামরিক স্বৈরাচারী সংস্কৃতি ধারণ করে নির্বাচিত (!) স্বৈরাচার রূপেই নিজেদের প্রমাণ দিয়ে এসেছে। নব্বই’র গণঅভ্যুত্থানে আত্মত্যাগীদের এবং আন্দোলনকারী জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার নজির সৃষ্টি করতে দ্বিধা করেনি। শাসক গোষ্ঠীর মধ্যকার ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতায় জনগণ প্রতীকী উপলক্ষ মাত্র। কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ।
স্বীকার করতেই হবে কেবল আমাদের দেশেই নয়, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাধীনে বিশ্বের প্রচুর দেশেই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছতার প্রমাণ পাওয়া যায় না। নির্বাচনী সহিংসতা, হানাহানি, কারচুপির অজস্র ঘটনা ঘটে থাকে। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের পীঠস্থান দাবিদার খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনেও প্রযুক্তিগত কারচুপির ঘটনা ঘটেছে। আমাদের প্রতিবেশী ভারতের প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেও পেশিশক্তি প্রয়োগে, আর্থিক বিনিয়োগ, সংঘর্ষ-হানাহানি, মানুষ হত্যার ঘটনাও ঘটে থাকে। মূল বিষয়টি হচ্ছে ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থাধীনে অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ নির্বাচন বাস্তবিকই দুরাশা। সরকার বদল অর্থাৎ শাসক বদলের নির্বাচনে কেবল শাসকেরই বদল ঘটে। সমষ্টিগত মানুষের বঞ্চিত জীবনের দিনবদলের উপায় থাকে না।
আমাদের অতীত ইতিহাসের কোনো নির্বাচনই শতভাগ অবাধ-নিরপেক্ষ, পূর্ণ গণতান্ত্রিক পন্থায় সম্পন্ন হয়েছে, তেমনটি কিন্তু বলা যাবে না। কম-বেশি কারচুপি সকল নির্বাচনেই হয়েছে। কিন্তু এখন যেরূপ ভয়াবহ মাত্রায় ঘটে আসছে, এরূপ কিন্তু ছিল না। এখন তো নির্বাচনে শাসক শ্রেণির অর্থ, পেশিশক্তি, মিডিয়া, রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্বে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে বারবার প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে। শাসকদের শাসনামলের অপকীর্তির দরুন জনগণের ওপর তারা আস্থা হারিয়ে ভিন্ন এবং অগণতান্ত্রিক পথাবলম্বন করে এসেছে, বাধ্য হয়ে। ক্ষমতায় থাকতে এবং ক্ষমতা পেতে শাসকগোষ্ঠীর প্রতিদ্বন্দ্বিতারই অপর নাম নির্বাচন। প্রতিদ্বন্দ্বী শাসকদের মধ্য থেকে জনগণ বেছে নেয় একটিকে, ভোটাধিকার প্রয়োগে। জনগণের ভোটাধিকারের ওপর আস্থাহীনতায় নির্বাচন ক্রমেই প্রহসনে পরিণত হয়ে পড়েছে। অপরদিকে জনগণকেও বঞ্চিত করা হয়েছে সাংবিধানিক অধিকার থেকে। তাই সঙ্গতকারণেই নির্বাচন নিয়ে জনগণের মাতামাতি, উৎসাহ-উদ্দীপনা আর তেমন দেখা যাচ্ছে না। বিপরীতে নির্বাচন নিয়ে তাদের মধ্যে শঙ্কা আতঙ্ক ভর করে আছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মানুষের আশাবাদ বিদায় নিলেও রাজনীতিকেরাও কিন্তু নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী হতে পারছে না। রাজনৈতিক মহলে নানা বিতর্ক ও শঙ্কার কথা শোনা যাচ্ছে। রাজনীতিকেরাও শঙ্কা-উদ্বেগে ভুগছে। তাদের কথায় ও কাজে সেটা প্রকাশ পাচ্ছে। শাসক দলও কিন্তু শঙ্কামুক্ত নয়। বিরোধী দল ও জোটের ন্যায় মহাজোট সরকারের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে শঙ্কার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গত জাতীয় নির্বাচনের পর এ যাবৎ প্রতিটি নির্বাচন নিয়ে টানাপড়েন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল ক্ষমতার দৌরাত্ম্যে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান রূপে দায়িত্ব গ্রহণে। বিচারপতি আজিজের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হবার পর তার দায়িত্বহীন-কা-জ্ঞানহীন নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্বসুলভ আচার-আচরণের মধ্য দিয়ে সেই যে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রশ্নবিদ্ধ হবার পালা শুরু হয়েছিল; তার থেকে আর পরিত্রাণ পাওয়া গেল না। অব্যবস্থাটা ধারাবাহিক হয়ে গেল। কিন্তু পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলেও চারদলীয় জোট সরকারের শেষরক্ষা হয়নি। সামরিক সমর্থনপুষ্ট দুই বছর মেয়াদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা দখলে। স্বীকার করতে হবে ওই সরকারের আমলে ভোটার তালিকা প্রণয়নে যুগান্তকারী কাজটি তারা করেছিল। ভোটার আইডি প্রবর্তনে ভুয়া বা জাল ভোটার তালিকার কারসাজি চিরতরে বিলীন করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু স্বাধীন নির্বাচন কমিশন পরবর্তীতে যেমন স্বাধীন থাকতে পারেনি, তেমনি জনগণের পূর্ণ আস্থাও অর্জন করতে পারেনি। দলীয় সরকারের প্রতি নির্বাচন কমিশনের আনুগত্যের প্রকাশ পেয়েছে নানা মাত্রায়। দেশের বিদ্যমান ব্যবস্থায় সকল অব্যবস্থার নিরসন আশা করা স্বপ্নতুল্য। কেননা বিদ্যমান ব্যবস্থাটিই গণতান্ত্রিক নয়। পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক এবং গণবিরোধী। এই ব্যবস্থাধীনে যা ঘটছে তা ওই ব্যবস্থারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। সম্প্রতি পাকিস্তানের নির্বাচনে দেখা গেছে সে-দেশের সামরিক বাহিনীর ধারাবাহিক কর্তৃত্বের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর হতে দেশটির শাসন-ক্ষমতায় সামরিক আমলাতন্ত্রের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল এবং আছেও। সেটার কখনো বিলোপ ঘটেনি। কখনো প্রকাশ্যে-কখনো অপ্রকাশ্যে সামরিক আমলাদের হাতেই ক্ষমতার ছড়িটি বরাবর ছিল। পাকিস্তানের বর্তমান বেসামরিক নির্বাচিত সরকারও সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট পুতুল সরকার। সামরিক আমলাদের ইশারা-ইঙ্গিতেই এই সরকারকে চলতে হবে। ব্যতিক্রম হলে গদি বাঁচাতে পারবে না। ক্ষমতা থেকে উত্তরসূরি বেসামরিক সরকারের অনুরূপ ভাগ্যবরণ করতে হবে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় এযাবৎ যারাই যে নামে-যেভাবেই ক্ষমতায় থাকুন না কেন তারা বিশেষ শ্রেণিরই প্রতিনিধি। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থ উপেক্ষায় তারা শ্রেণিস্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। তাই দেশজুড়ে শ্রেণি শাসন প্রবল আকারে বিস্তার লাভ করেছে। জনগণের ওপর নানা মাত্রায় শোষণ প্রক্রিয়া সবল হয়েছে। বঞ্চিত জনগণের ভোটের মাধ্যমে দিন-বদলের কোনোই আপাত সম্ভাবনা নেই। সাঁতার না জানা মানুষ যেমন পানিতে ডুবে যাবার পূর্বে কচুরিপানা ধরেও বাঁচার নিষ্ফল চেষ্টা করে, কিন্তু বাঁচতে পারে না। ডুবে মরে। আমাদের জনগণও তাদের ভাগ্যবদলে নির্বাচনের ওপর ভরসা করে সত্য কিন্তু এযাবৎকালের কোনো নির্বাচনই তাদের ভাগ্যবদল করতে পারেনি। বিপরীতে শাসক বদলের নির্বাচনে ধোঁকা খেয়ে খেয়ে বোকায় পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যে জনগণ বুঝে গেছে নির্বাচন মাত্রই ক্ষমতার পালাবদল, তাদের ভাগ্যবদল নয়। বিদ্যমান ব্যবস্থাধীনে গণমানুষের ভাগ্যবদল সম্ভব হবে না, এটাই চরম বাস্তবতা।
তাহলে উপায় কী? উপায় হচ্ছে ব্যবস্থার বদল। অর্থাৎ সামাজিক বিপ্লব ছাড়া সমষ্টিগত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিকল্প পথ নেই। সশস্ত্র বিপ্লব একাত্তরে আমরা সম্পন্ন করেছি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা প্রতিষ্ঠার লড়াই শেষ হয়নি। সেই চেতনা হচ্ছে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা। যেটি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সরকারের ঘোষিত শাসনতন্ত্রের মূল স্তম্ভ হিসেবে জনমনে আশার সঞ্চার করতে পেরেছিল। সেটার বাস্তবায়নে প্রয়োজন সামাজিক বিপ্লব। একমাত্র সামাজিক বিপ্লবেই শ্রেণি শোষণের কবল থেকে সকল মানুষের অধিকার ও সুযোগের সমতা প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করবে। যেটি নির্বাচনের মাধ্যমে অতীতেও সম্ভব হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। শাসক পরিবর্তনের নির্বাচনে কেবল শাসক বদল হবে, ব্যবস্থাটা অপরিবর্তিতই থেকে যাবে। জনগণের মুক্তি আসবে না। তাই প্রয়োজন ব্যবস্থার বদল। ব্যবস্থার বদল ব্যতীত সমষ্টিগত মানুষের দিনবদল যে সম্ভব হবে না, এটাই চরম সত্য-বাস্তবতা।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

সাপ?তাহিক পতিবেদন

ফিচার ও অন্যান্য
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.