[প্রবাস প্রতিবেদন] ভেনিসের কা’ফোসকারি ফেলোশিপে সম্মানিত হলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস

Print Friendly and PDF

পলাশ রহমান, ইতালি থেকে

ইউরোপের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় কা’ফোসকারির বিশাল অডিটরিয়ামে আমরা প্রবেশ করলাম বিকেল ৫টা বাজার কিছু আগে। বসার জন্য একটি আসনও ফাঁকা পেলাম না। জানা গেল সীমিত আসন সংখ্যা অনেক আগেই অনলাইনে বুক হয়ে গেছে। ডানে বাঁয়ে চোখ বুলিয়ে দেখলাম বসার জায়গা না পেয়ে অনেকেই দাঁড়িয়ে আছেন। আমরাও দাঁড়িয়ে গেলাম।
গোটা হল নীরব। কারও নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে না। মনে হলো কেউ যেন নিঃশ্বাসও ফেলছেন না, শুধুমাত্র একটি ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করছেন।
ঠিক ৫টার সময় নাম ঘোষণা করা হলো আমাদের প্রফেসর ইউনূসের। কত উপাধিতে যে সম্মান করা হলো, কত যে বিনয়ের সঙ্গে তার নাম উচ্চারণ করা হলো তা বলে শেষ করা যাবে না।
মুহাম্মদ ইউনূস স্টেজে এলেন। গোটা হল দাঁড়িয়ে গেল। টানা পাঁচ মিনিট হাতে তালি দিয়ে তাকে অভিবাদন জানানো হলো। তিনিও কার্পণ্য করলেন না। চিরচেনা বিখ্যাত হাসি দিয়ে এবং হাত নেড়ে সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। বক্তৃতা করলেন টানা দেড় ঘণ্টা। বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘এ ওয়ার্ল্ড অফ থ্রি জিরোস’।
বক্তৃতার শুরুতে এত চমৎকারভাবে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করলেন যা শুনে আবেগী না হয়ে পারলাম না। মনে হলো বিশাল ক্যানভাসে মনের মাধুরী মিশিয়ে তিনি বাংলাদেশের ছবি আঁকলেন।
দীর্ঘ প্রবাস জীবনে বাংলাদেশের বহু মানুষের বক্তৃতা শুনেছি। বহু রাজনীতিক শিল্পী সাহিত্যিকের আলোচনা সমালোচনা শুনেছি এই প্রবাসে। কিন্তু এত দরদ দিয়ে, এত মধুর করে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করতে কাউকে দেখিনি।
তিনি গ্রামবাংলার অপরূপ দৃশ্য তুলে ধরলেন। মানুষের সরল জীবন তুলে ধরলেন। নদীমাত্রিক বাংলাদেশ এবং ইউরোপের জলকন্যা ভেনিসের মধ্যে চমৎকার এক সামঞ্জস্য তুলে ধরলেন। আমাদের সম্ভাবনার কথা বললেন। সততার কথা বললেন। সব মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশকে একখ- স্বর্গের মতো উপস্থিত সবার চোখের মণিতে গেঁথে দিলেন।
অডিটরিয়ামের বাইরে তখনো অনেক তরুণ-তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। যদি কোনোভাবে ভেতরে ঢোকা যায়, মুহাম্মদ ইউনুসের কিছু কথা শোনা যায়।
মুহাম্মদ ইউনূস তিনি শূন্যের এক বিশ্ব নিয়ে বিস্তর আলোচনা করলেন। মাইক্রো ক্রেডিট, সোস্যাল বিজনেস নিয়ে আলোচনা করলেন। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রফেসর ইউনূসকে ফেলোশিপ প্রদান করা হলো।
উল্লেখ্য, গত ৩০ সেপ্টেম্বর ইতালির মিলানো শহরে মুহাম্মদ ইউনূসকে সোকা গাকাই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নিউ রেনেসাঁ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

২.
ইতালির ভেনিসের কা‘ফোসকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউরোপের অন্যতম বিখ্যাত একটি বিশ্ববিদ্যায়ে। এর দেড়শ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ২ অক্টোবর ভেনিসের সানতা মারগেরিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে একমাত্র অতিথি ছিলেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী আমাদের প্রফেসর ইউনূস।
সেখানে বিশ্ববিখ্যাত শত শত প্রফেসর উপস্থিত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। কেউ কোনো কথা বললেন না। যা বলার শুধু আমাদের প্রফেসর ইউনূস বললেন। সবাই তার কথা শুনলেন। মনে হলো আজ সবাই শুধু শুনতেই এসেছেন।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, প্রচলিত ধারার অর্থনীতির বাইরে নতুন ধারার অর্থনীতি চালুর মাধ্যমে বিশ্বে তিন শূন্য প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। শূন্য দরিদ্রতা, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বন নির্গমন। এই তিন শূন্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া আমাদের প্রজন্মের জন্য, আমাদের তরুণ তরুণীদের জন্য বিরাপদ বিশ্ব রেখে যাওয়া সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিকদের সোস্যাল বিজনেস বুঝতে হবে। আমাদের তরুণ-তরুণীদের মাথায় গেঁথে দিতে হবে, চাকরি প্রত্যাশী হওয়া থেকে উদ্যোক্তা হওয়া অনেক বেশি সহজ এবং সম্মানের।
প্রচলিত ব্যবসা পদ্ধতিতে একজন মানুষ ধনী হয়। ব্যবসায় সব আয় উপর দিকে চলে যায়। এতে কোনোভাবেই সমাজের চিত্র বদলায় না। দরিদ্রতা কমে না। দিনের পর দিন বেকারত্ব, দরিদ্রতা বাড়তে থাকে। রাষ্ট্র বেকারভাতা দিয়ে তা ঢেকে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু সবসময় সম্ভব হয় না। এক সময়ে মহামারী আকার ধারণ করে। যেমনটা এখন হয়েছে। এখন আর কোনো সরকারই বেকারভাতা দিয়ে দরিদ্রতা ঢেকে রাখতে পারছে না। সুতরাং বেকারভাতা কোনো সমাধান নয়, এতে সমস্যা আড়াল করা হয়।
সমস্যার সত্যিকারের সমাধানের জন্য দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনতে হবে। আলাদা ব্যাংকিং আইন করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের আত্মমগ্নতা কমাতে হবে। সব কিছু নিজের জন্য এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে সোস্যাল ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে হবে। যেখানে শুধুমাত্র নিজে বড়লোক হওয়া নয়, সবাই ভালো থাকার মানসিকতা থাকতে হবে।
প্রফেসর ইউনূস বলেন, উদ্যোক্তা বাড়াতে পারলেই বিশ্ব অর্থনীতির চাকা নতুন করে ঘোরা শুরু করবে। দরিদ্রতা, বেকারত্ব জাদুঘরে পাঠানো সম্ভব হবে।
তিনি তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার উদ্দেশ্য যদি হয় একটা ভালো চাকরি জোগাড় করা তাহলে আমরা বিশ্ব থেকে বেকারত্ব, দরিদ্রতা দূর করতে পারব না।
ভালো বেতনের চাকরি জোগাড় করার চিন্তা সবার আগে মাথা থেকে বের করে ফেলতে হবে। নতুন করে ভাবতে হবে। নিজের ভেতরের সৃষ্টিশীলতায় বিশ্বাস রাখতে হবে।
তিনি বলেন, শান্তিময় বিশ্ব গড়ার জন্য মানুষের সৃষ্টিশীলতা জাগিয়ে তোলা এবং কার্বন নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমি বিশ্বাস করি মানুষের মধ্যে অফুরন্ত সৃষ্টিশীলতা আছে। শুধুমাত্র সাহস এবং পরিবেশের অভাবে তা চাপা পড়ে থাকে। সেগুলো জাগিয়ে তুলতে হবে। শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য চাকরি খোঁজা নয়, বরং সৃষ্টি করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, চাকরির ক্ষেত্রে কোনো সৃষ্টিশীলতা থাকে না। উপরের অর্ডার পালন করতে হয়। এতে তরুণ-তরুণীদের মেধা ভেঙে পড়ে। সৃষ্টিশীলতা হারায়। এক সময় তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে কোনো সৃষ্টিশীল মেধা তাদের মধ্যে নেই। যা একেবারেই ভুল ধারণা। এবং এই ভুল ধারণার কারণেই বর্তমান বিশ্ব বেকারত্ব এবং দরিদ্রতার ভারে ভারাক্রান্ত।
প্রফেসর ইউনূস বলেন, অক্সিজেন না থাকলে যেমন আমরা বাঁচতে পারব না, তেমনি অর্থনৈতিক অক্সিজেনের পাইপ ঠিক না থাকলে বিশ্ব চলবে না।

৩.
মুহাম্মদ ইউনূস, ১৯৪০ সালের ২৮ জুন চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ এবং গরিবের ব্যাংকার হিসেবে তার বিশ্বখ্যাতি রয়েছে। ২০০৬ সালে তিনি এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন এবং বিশ্ববিখ্যাত ভানডেরবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করেন। ১৯৬৯ সালে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমান পৃথিবীতে তার মতো এত বেশি পুরস্কারপ্রাপ্ত জীবিত মানুষ আর নেই। অর্থাৎ বিশ্বের সব বিখ্যাত পুরস্কারে ইতোমধ্যেই তিনি সম্মানিত হয়েছেন। তার হাত ধরেই ডিক্সনারিতে মাইক্রোক্রেডিট এবং সোস্যাল বিজনেসের শব্দ লিপিবদ্ধ হয়।
palashrahman@yahoo.com

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রবাসে
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.