শ্রীলঙ্কায় চীন-ভারত দ্বন্দ্বের ফল কী? -আনিস রায়হান

Print Friendly and PDF

বিক্রমাসিংহে সবেমাত্র তিন দিনের ভারত সফর শেষ করে দেশে ফিরেছেন। ধারণা করা হচ্ছিল, ভারতের সমর্থন পেয়ে তার সরকারের শক্তি আরও বাড়বে। কিন্তু ‘রাজনীতির খেলা’ বলে কথা, শক্তিশালী হওয়া তো দূরে উল্টো মসনদই হারিয়ে ফেললেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বিক্রমাসিংহের অপসারণ, রাজাপাকসেকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনয়ন, নতুন মন্ত্রিসভা গঠন, সংসদ স্থগিত করা, শ্রীলঙ্কার রাজনীতির এসব অস্থিরতার খবর এখন আর কারোই অজানা নয়।
মোটাদাগে ঘটনা হলো শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করে রাজাপাকসেকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। নতুন সরকার মন্ত্রিসভাও পুনর্গঠন করেছে।
ঘটনা শেষ অবধি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সবার নজর এখন সেদিকেই। শ্রীলঙ্কার রাজনীতির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অর্থনীতির বাস্তব সংকট, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর তৎপরতাসহ বিশ্ব রাজনীতির নানা সমীকরণ এখানে ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে চীন-ভারত দ্বন্দ্বের বিষয়টি তো একেবারেই প্রকাশ্য, পশ্চিমা শক্তিগুলোও পিছিয়ে নেই। সব পক্ষই নিজের লাভ হাতিয়ে নিতে উন্মুখ, কিন্তু শ্রীলঙ্কার জনগণের কী হবে?
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে চীনা ফ্যাক্টর ক্রমশ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সেই সূত্রে চীন-ভারত দ্বন্দ্বও প্রবলতর হচ্ছে দিনকে দিন। অপরাপর বিশ্বশক্তিগুলো এসব সুযোগ কাজে লাগাতে সক্রিয়। মালদ্বীপ-শ্রীলঙ্কায় আজ যা ঘটে চলেছে, বাংলাদেশ সেখান থেকে অনেক দূরে, এমনটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। শক্তিধর দেশগুলোর পদক্ষেপ এবং শ্রীলঙ্কার ঘটনাবলির দিকে মনোযোগ দেয়া তাই খুবই জরুরি।

২.
শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট হলেন সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তি। প্রধানমন্ত্রী তার ডেপুটি হিসেবে মন্ত্রিসভার নেতৃত্ব দেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী  মাহিন্দা রাজাপাকসের পুরনো রাজনৈতিক মিত্র। রাজাপাকসে গতবার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, ২০১৫ সালের নির্বাচনে তাকে রোখার জন্য বিক্রমাসিংহে ও সিরিসেনা জোট বেঁধেছিলেন।  
সিরিসেনা তখন বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন রাজাপাকসের সঙ্গে। বিক্রমাসিংহের সঙ্গে যোগ দিয়ে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার কথা ঘোষণা করার আগের রাতে রাজাপাকসের সঙ্গে নৈশভোজ সেরেছিলেন। বিক্রমাসিংহে যেন সেই প্রতিদানই পেলেন, এবার খুব গোপনে তার পিঠে ছুরি মারলেন সিরিসেনা। যদিও রাজাপাকসের সঙ্গে সিরিসেনার আপস আলাপ চলছিল, কিন্তু এভাবে প্রধানমন্ত্রীকে বহিষ্কার করে তাকে স্থলাভিষিক্ত করা হবে, এটা কেউ সন্দেহ করেনি।
সিরিসেনা ক্ষমতায় এসেছিলেন রাজাপাকসের আমলের নানা পদক্ষেপের বিরোধিতা করে। তার অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সংকুচিত করা হবে, কিন্তু ওসব নির্বাহী ক্ষমতাকেই তিনি হাতিয়ার বানালেন। রাজাপাকসে সমালোচিত হয়েছিলেন, কারণ তার আমলে ভয়ঙ্কর নৃশংসতা দিয়ে তামিলদের বিদ্রোহ দমন করা হয়েছিল। অর্থনৈতিকভাবে তিনি চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন, ভারত ও পশ্চিমাদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছিলেন।
মুসলিমবিরোধী উসকানি, উগ্র সিংহলি জাতীয়তাবাদের প্রচার ও বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের রাজনৈতিক সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে রাজাপাকসে সবচেয়ে অগ্রসর। তবে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে ভারতের প্রভাবকে দুর্বল করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তিনিই পালন করেছেন। তামিল টাইগাররা ভারত থেকে গোপন পৃষ্ঠপোষকতা পেত, সিংহলী সমাজে এই ধারণা বেশ শক্তিশালী ছিল। ফলে রাজাপাকসে তামিল নিধন ও ভারতকে বিরোধিতার সূত্রে সিংহলীদের কাছে জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তবে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপপ্রয়োগ তার জনপ্রিয়তায় ভাটা ফেলে। যদিও ২০১৫ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে ভারতের হাত রয়েছে বলে মনে করেন তার দলের নেতাকর্মীরা।

৩.
সিরিসেনা রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ভারত তাকে দ্রুত অভিনন্দন জানিয়েছিল। কিন্তু দ্রুততার সঙ্গেই তিনি চীনের দিকে হেলে পড়েন। তবে ২০১৫ সালের সংবিধান সংশোধনীর কারণে নতুন কাঠামোতে আগের তুলনায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ছিল কম। ফলে প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে জাপান ও ভারতমুখী পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে নানামুখী উদ্যোগ নিতে থাকেন। এসব প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নানা সংকট সুরাহায় ব্যর্থতার জন্যও প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করেন প্রেসিডেন্ট।
সম্প্রতি এসবের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন ইস্যু। অর্থনৈতিক সংস্কার, গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উদ্যোগ এবং তামিলবিরোধী গৃহযুদ্ধকালে সেনাবাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিয়ে সিরিসেনা ও বিক্রমাসিংহের মধ্যে বিরোধ আরও বৃদ্ধি পায়। বিভেদের বিষয়টি চলতি মাসে চরম রূপ ধারণ করে, যখন বিক্রমাসিংহে নয়াদিল্লি সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ অন্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল শ্রীলঙ্কায় ভারতের অর্থায়নে নির্মাণাধীন বেশকিছু প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করা, যে প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারত চিন্তিত।
কিন্তু বিক্রমাসিংহের সফরের মাত্র কয়েক দিন আগে, ভারতীয় দৈনিক দ্য হিন্দুতে দাবি করা হয়, সিরিসেনা মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে বলেছেন যে, নয়াদিল্লির শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র) মোদিকে না জানিয়ে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল। বিক্রমাসিংহের মন্ত্রীদের একজন এই চক্রান্তের সঙ্গে যুক্ত এবং পুলিশ এই হত্যাচেষ্টার তদন্তে গাফিলতি করেছে বিক্রমাসিংহের প্রভাবে, পরবর্তীতে এমন অভিযোগ করেন সিরিসেনা। তার দাবি, বিক্রমাসিংহেকে বহিষ্কারের এটাই মূল কারণ।

৪.
সিরিসেনা অভিযোগ করেন, হত্যা চক্রান্তের তদন্তের ভার তিনি সিআইডি’কে দিয়েছিলেন। কিন্তু আইজিপি দায়িত্বটি সিআইডি’কে দেননি, দেন আরেকটি বিভাগকে। অভিযোগ ওঠার ৪৮ ঘণ্টা পার হলেও তদন্ত শুরু হয়নি। তার বদলে আইজিপি টেপ রেকর্ডিংয়ে অভিযোগকারীর কণ্ঠ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। সিরিসেনা বলেন, ‘যখন দেশের প্রেসিডেন্টকে হত্যা চক্রান্তের অভিযোগ উঠেছে তখন কোনো প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের মতামত নেয়া ছাড়াই তিনি রেকর্ডিংয়ের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করতে পারেন?’
বিক্রমাসিংহে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের বন্ড কেলেঙ্কারি ও ব্যাংকের গভর্নর ও দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া, ব্রোকার অর্জুনা মাহেন্দ্রান বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
সিরিসেনা বলেন, তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আমার পরিদর্শন ঠেকাতে চেয়েছে। জনগণের দাবির মুখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনিয়ম তদন্তের জন্য আমি কমিশন গঠন করি। কমিশন স্বাধীনভাবে তদন্ত শুরু করলে তারা আম্র চাপপ্রয়োগ শুরু করে। মাহেন্দ্রানকে শ্রীলঙ্কায় ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দায়িত্ব ছিল বিক্রমাসিংহের। কিন্তু তা হয়নি কারণ সবাই জানেন যে মাহেন্দ্রান ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
ঘুষ ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করার জন্যও বিক্রমাসিংহেকে অভিযুক্ত করেন সিরিসেনা। প্রেসিডেন্ট বলেন, দুর্নীতির মামলাগুলো দ্রুত বিচারের জন্য একটি নতুন আইন করার প্রচেষ্টা চালানো হয় কিন্তু তা স্থবির হয়ে আছে। বিক্রমাসিংহের সরকার টেন্ডার ছাড়াই অনেক মূল্যবান সম্পদ বিদেশিদের দিয়ে দিয়েছে। টেন্ডার ছাড়া নির্মাণ কাজও দেয়া হয়েছে।
এ ধরনের টেন্ডার প্রদানের জন্য জরুরি ক্যাবিনেট পেপার দেয়া হয়েছে এবং মন্ত্রিসভায় আপত্তি থাকার পরও বিশাল নির্মাণ কাজ দেয়া হয়েছে। ক্যাবিনেট পেপারগুলো আটকে না দিলে শ্রীলঙ্কার সম্পত্তি সহজেই বিদেশিদের হাতে চলে যেত। বিক্রমাসিংহে সরকারের প্রস্তাবিত ল্যান্ড অর্ডিনেন্স স্পেশাল অ্যাক্ট যদি মন্ত্রিসভা পাস করত তাহলে আমাদের মাতৃভূমির সব ভূমি কোনো বাধা ছাড়াই বিদেশিদের কাছে বিক্রি করে দেয়া যেত।

৫.
সিরিসেনার দাবিগুলো কতটা গ্রহণযোগ্য তা গভীর তদন্তের বিষয়। তবে সেখানকার স্থানীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যে রাজাপাকসের দিকে হেলে পড়ছিল, এটা সবার জানা। গত ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজাপাকসের নবগঠিত শ্রীলঙ্কা পদুজনা পেরামুনা (এসএলপিপি) বিপুল বিজয় লাভ করার পর সিরিসেনা ও বিক্রমাসিংহের মধ্যে বিভেদ প্রকট হয়ে পড়ে।
রাজাপাকসের ওই জয়ের পর জোট সরকার ত্যাগ করার জন্য সিরিসেনার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে তার নিজের দল, আগে কিনা যার নেতা ছিলেন রাজাপাকসে। এসএলএফপি নেতারা রাজাপাকসের সঙ্গে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলার জন্য মত দেন। তারা সাবেক এই প্রেসিডেন্টকে প্রধানমন্ত্রী করার জন্য সিরিসেনার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। কারণ ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনে রাজাপাকসে পরিবারের সদস্য ও তার দল এসএলপিপি’র জয়ের সম্ভাবনা খুবই প্রবল। রাজাপাকসের পক্ষে রয়েছে জাতীয়তাবাদী সিংহলা বৌদ্ধ ভোট।
জানা যায়, এরপর দুই পক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক বেশকিছু বৈঠক হয়। চলমান সরকার থেকে বের হয়ে রাজাপাকসের এসএলপিপির সঙ্গে জোট বাঁধার আগে সিরিসেনা তার দল এসএলএফপির ২৩ জন সদস্যের সঙ্গে বৈঠক করেন। তখনই বিক্রমাসিংহেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত হয়। সিরিসেনা আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন এবং রাজাপাকসে তার সঙ্গেই থাকবেন। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা আরও বাড়বে। দুই নেতার মধ্যে এ ধরনের সমঝোতার কথা শোনা যাচ্ছে।
এর সঙ্গে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। যদিও চার বছর আগে চীনবিরোধী ও ভারতপন্থি হিসেবেই ক্ষমতায় এসেছিলেন সিরিসেনা। এখন দেখা যাচ্ছে, রাজাপাকসের চীনা শিবিরেই ঘাঁটি গেড়েছেন তিনি। সিরিসেনা ও রাজাপাকসের বৈঠকের দিনগুলোতে ভারতীয় বিনিয়োগপুষ্ট কিছু প্রকল্পের বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়। আবার শ্রীলঙ্কায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতের বরাত দিয়ে জুলাই মাসে সিরিসেনা জানান যে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং একটি প্রকল্পের জন্য ২ বিলিয়ন ইউয়ান উপহার দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি চীনা রাষ্ট্রদূতের কাছে একটি প্রকল্পের প্রস্তাব দিতে যাচ্ছি। সেটা হলো দেশের সব নির্বাচনী এলাকায় আবাসিক বিল্ডিং তৈরির প্রকল্প।’

৬.
শ্রীলঙ্কার ঘটনাপ্রবাহ বুঝতে দেশটির অর্থনীতির দিকেও নজর দেয়া দরকার। রাজাপাকসে তার আমলে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য চীনের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে তার নিজের এলাকা হামবানতোতায় নির্মিত বন্দর প্রকল্প। ঋণ পরিশোধের জন্য ওই বন্দরটিকেই চীনা কোম্পানির হাতে ৯৯ বছরের জন্য তুলে দিতে হয়েছে। শ্রীলঙ্কার সরকারের পুরো সরকারি মুনাফার ৮০ শতাংশই ব্যয় হয় ঋণের কিস্তি পরিশোধে। চীন যে ঋণের ফাঁদে ফেলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে বাঁধতে চাইছে, এটাকে তার সপক্ষে জোরালো প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়।  
অর্থনীতিতে চীনা আগ্রাসনের ফল দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১০ সালে শ্রীলঙ্কার বিদেশি ঋণের পরিমাণ জিডিপির ৩৯ শতাংশ ছিল। রাজাপাকসের পরাজয়ের বছর ২০১৫ সালে সেটা জিডিপির ৯৪ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। ২০১৬ সালে সিরিসেনা সরকার আইএমএফ থেকে ঋণ সহায়তা নিয়ে অর্থনীতি পুনর্গঠনের চেষ্টা করে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হন।
প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহে ভারত, জাপানসহ পশ্চিমা জোটের অর্থনৈতিক বলয়ে দেশকে নিয়ে যেতে চাইছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের উত্থান ও দেশটির দক্ষিণ এশীয় নীতি পুনর্গঠনের কারণে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে চীনের অর্থায়ন ও বিনিয়োগের কোনো বিকল্প প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র এখনও হাজির করতে পারেনি।
সিরিসেনার দরকার ছিল দ্রুত সমাধান। চীন তো হাত বাড়িয়েই বসে ছিল। তিনি চীনের কিছু প্রকল্প সংশোধন করে এগিয়ে নেয়ার পক্ষে মত দেন। এভাবে চীনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো হতে শুরু করে। সব মিলিয়ে সিরিসেনার পক্ষে চীনের দিকে হেলে না পড়া ছাড়া আর কোনো গতি ছিল না। কারণ এই অঞ্চলে চীন যে ধরনের আর্থিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে হাজির, তার প্রতিপক্ষরা এর বিপরীতে তেমন কিছুই দিতে পারছে না।
সুযোগ পেয়েই চীনা কূটনীতিকরা সক্রিয় হন, শ্রীলঙ্কায়ও তারা নেপাল মডেল প্রয়োগ করেন। নেপালে জনপ্রিয় বাম দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে চীনারা ভূমিকা রাখে। এখানেও রাজাপাকসের সঙ্গে সিরিসেনার ঐক্য ঘটাতে ভূমিকা রাখে তারা। পাশাপাশি আর্থিক সহায়তাও জারি রাখে চীন।
ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কান রুপির মূল্যমান ২৮ শতাংশ পড়ে গেছে। শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া হয়ে যাওয়া, রাস্তায় অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন সাংসদরা। প্রেসিডেন্ট বলেছেন, অর্থনীতি রক্ষা করতে গেলে নতুন আর্থিক নীতি বাস্তবায়ন প্রয়োজন। সেজন্যই রাজাপাকসেকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি।
২৯ অক্টোবর ২০১৮ গঠিত হয় নতুন মন্ত্রিসভা। দেখা যায়, অর্থ মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রী নিজের হাতেই রেখেছেন। ৫ নভেম্বর বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা বাতিল করা হয়েছে। সিরিসেনা ও রাজাপাকসে এখন নতুন করে বাজেট করবেন যেন অন্তত প্রাদেশিক নির্বাচনের আগে ভোটার টানা যায়।
রাজাপাকসে ইতোমধ্যে কর হ্রাস করেছেন, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম কমিয়ে এনেছেন। তিনি স্থানীয় শিল্প রক্ষায় সংরক্ষণবাদের আশ্রয় নেয়ার কথাও জানিয়েছেন। অন্যদিকে বিক্রমাসিংহে সরকার পাশ্চাত্যের কাছে নতি স্বীকার করে উদারবাদের নামে বাজার খুলে দিয়েছিলেন বলে তার অভিযোগ।
রাজাপাকসের নেতৃত্বাধীন অর্থ মন্ত্রণালয় ১ নভেম্বর ঘোষণা করেছে, তারা বাজেট নতুন করে বিবেচনা করবে এবং সেইসঙ্গে বেশ কয়েকটি খাতের করে ছাড় দেবে। তবে তাদের এই পরিকল্পনা কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে বিশ্লেষকরা ইতোমধ্যেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
জনসাধারণের দুর্ভোগ হ্রাস করার জন্য ইতোমধ্যেই পেট্রোলের দাম ১০ রুপি ও ডিজেলের দাম ৭ রুপি করে কমানো হয়েছে। তাছাড়া কৃষকদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ ও কম মূল্যে সার পাওয়া নিশ্চিত করা হচ্ছে। আর পেশাদার লোকদের সুবিধা দেয়া হচ্ছে আয়করে ছাড় দিয়ে।
শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে চীনা প্রভাব কতটা তা বোঝা যাবে গেল সপ্তাহে বিদেশি দূতদের সম্মুখে সিরিসেনার দেয়া বক্তব্য থেকে। তিনি বলেছেন, ইউরোপে শ্রীলঙ্কার পণ্যের জন্য জিএসপি প্লাস কর ছাড় যদি প্রত্যাহারও করা হয়, তাতে তিনি কিছু মনে করবেন না।

৭.
কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতির অনুপস্থিতিতে চীন তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। জাপান বা ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হতে পারেনি। বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ না চীনের বিনিয়োগের তুলনামূলক মাত্রায় অবকাঠামো বিনিয়োগের ব্যাপারে ভারত মহাসাগর অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির জন্য এ অঞ্চলের দেশগুলোর নেতারা বেইজিংয়ের দ্বারস্থ হতেই থাকবে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্র দেশগুলো যতই ভয়ভীতি দেখাক না কেন।
ভারত অবশ্য রাজাপাকসের উত্থানের খবর জানত। তারা রাজাপাকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে সব ধরনের আগ্রহই দেখিয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে নয়াদিল্লিতে উষ্ণ সংবর্ধনা দেয়া হয় রাজাপাকসেকে। কিন্তু রাজাপাকসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের পর পরিষ্কার হয়ে গেল যে, চীন এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে।
ভারত যদিও কৌশল নিয়েই এগোচ্ছিল, কিন্তু বিক্রমাসিংহের বহিষ্কারের জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। যে কারণে এখন তাদের অবস্থান প্রকাশ্য হয়ে গেছে। পশ্চিমাদের অঙ্গে সুর মিলিয়ে ভারতও বিক্রমাসিংহের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। এটা ইঙ্গিত দেয় যে, তারা বিক্রমাসিংহের প্রত্যাবর্তন ঘটবে বলে আশা রাখে। মিয়ানমারে সেরকম কোনো পক্ষ না থাকায় ভারত সেক্ষেত্রে পশ্চিমা মিত্রদের বিরুদ্ধে গিয়ে মিয়ানমারের চীনা সমর্থনপুষ্ট সরকারকেই সমর্থন দিয়েছে।
এই হিসাব-নিকাশ খুব জোরেশোরেই চলছে যে, সংসদে কত ভোট আছে, কারা জিতবে, কারা হারবে! আপাতদৃষ্টে বিক্রমাসিংহের পক্ষে সাংসদ বেশি দেখা গেলেও এটা সবার জানা যে, আড়ালে সাংসদ বেচাকেনা চলছে। পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে যদি রাজাপাকসে হেরে যান, তবে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হতে পারে।
সিরিসেনা-রাজাপাকসে শিবির আশা করছে, শ্রীলঙ্কা পদুজনা পেরুমানা (এসএলপিপি) আসন্ন নির্বাচনে বেশ ভালো করবে। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে রেকর্ড জয়ের পর তাদের এই আশাবাদ প্রবল হয়েছে। শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণও এসএলপিপিকে সমর্থন করবে। তারা ইতোমধ্যেই ‘পাশ্চাত্যের কাছে বিক্রি হওয়া থেকে শ্রীলঙ্কাকে রক্ষা’ করার ডাক দিয়েছে।
এসব কারণে বিক্রমাসিংহের পক্ষ থেকে কিছু সাংসদ হটে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাছাড়া দলটির অনেকেই মনে করেন, দেশের এই আর্থিক পরিস্থিতিতে প্রাদেশিক ও জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে গেলে আর্থিক সংকট বাড়বে। এতে করে রাজনৈতিক বিপর্যয়ও ঘটতে পারে।

৮.
পরিস্থিতি নির্দেশ করছে দক্ষিণ এশিয়া ক্রমশ পরাশক্তিগুলোর শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হয়ে উঠছে। এই অঞ্চলের রাজনীতি ক্রমশ ঘোলাটে চেহারা ধারণ করছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। বিভিন্ন দেশের সরকার নিজ নিজ নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখতে বিশ্ব মোড়লদের দ্বারস্থ হচ্ছে। চীন-ভারতের প্রতিযোগিতা বেড়েই চলেছে। যদিও এটা প্রমাণ হয়ে গেছে যে, ভারতের পক্ষে চীনকে ঠেকানো সম্ভব নয়।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ পলিসি যদিও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হিসেবে অভিহিত হচ্ছে, কিন্তু কার্যত এই প্রকল্পে এত বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে যে, এর সঙ্গে রাজনীতি ও সামরিক শক্তি চলে আসতে বাধ্য। এত বিপুল বিনিয়োগ করলে অবশ্যই বন্ধু ও অনুগত দাস সৃষ্টি হবে, তেমনি এই সম্পদের নিরাপত্তার প্রশ্নে সামরিক বাহিনীকেও যুক্ত হতে হবে।
চীনা প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা আসলে সুপার পাওয়ার হওয়া। তাই এই প্রকল্প যেসব অঞ্চলে বিস্তৃত হচ্ছে, সেসব এলাকায় চীনা প্রভাব বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি চীনবিরোধীরা এসে সেখানে জুটছে, তারা সেখান থেকে সুবিধা নিতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্র যদিও কিছুটা অনুপস্থিত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের নীতিই বাস্তবায়িত হচ্ছে। ওবামা আমলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বলেছিলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াই হবে আগামী দশকে মার্কিন সামরিক ক্ষমতা মোতায়েনের মূল মঞ্চ। আর তার লক্ষ্য হবে চীনকে মোকাবিলা করা এবং এই অঞ্চলে অস্ত্রের বাজার বিস্তৃত করা।
ট্রাম্প আমলে সেটা কিছুটা সরে পুরোপুরি দক্ষিণ এশিয়ায় এসে পড়েছে। এশিয়া প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি এখন হয়েছে ইন্দো প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একই। শুধু আগের পরিকল্পনার কেন্দ্র ছিল দক্ষিণ চীন সাগর, আর এখন কেন্দ্রটা সরে এসেছে ভারত মহাসাগরে, বিশেষত বঙ্গোপসাগরের আশেপাশে।  
এভাবে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে নেপথ্য ভূমিকা পালন করছে মার্কিন ও চীনা নীতি। এই অঞ্চলের দেশগুলো এক্ষেত্রে আঞ্চলিক কোনো ঐক্য গড়ে তুলতে পারেনি। তারা দুই পক্ষে দ্রুত বিভাজিত হয়ে এই অঞ্চলকে শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র হিসেবে উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। এটা বড় আতঙ্কের। কারণ ইউরোপীয় নেতারা আর ইউরোপে কোনো যুদ্ধ চায় না। মধ্যপ্রাচ্যে অনেক হয়েছে। চীন সাগরে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে বিশ্ববাণিজ্যে তার প্রভাব পড়ে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে থাকে না। তাছাড়া এ অঞ্চলে কোনো যুদ্ধ বাধলে ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্যের মূল্য দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেন বাণিজ্য বিশ্লেষকরা। ফলে দক্ষিণ এশিয়া বলির পাঁঠায় পরিণত হতে পারে।
ভারত পশ্চিমাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দ্রুত সেই সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। নিজ দেশের জনগণের দাবি-দাওয়া, মতামত ভারতের রাজনীতিকরা শুনছেন না। তারা আঞ্চলিক আধিপত্যের নেশায় এমনকি দেশীয় পুঁজির বিকাশকেও জলাঞ্জলি দিচ্ছে। চীন এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার মতোই নতুন এক আগ্রাসী শক্তি হিসেবে হাজির হচ্ছে। তারা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ভারতের মাতুব্বরি ও নিপীড়নের সুযোগ নিয়ে এখানকার রাজনীতিকদের দ্রুত কিনে নিচ্ছে।
এভাবে চলতে থাকলে এই অঞ্চলের গণমানুষকে অনেক দুর্ভোগই পোহাতে হবে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুও অনেকখানি চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বের ফল বলেই অনেকে মনে করেন। এরকম নানামুখী দুর্ভোগ একের পর এক আসতে থাকবে। চীন ঘাঁটি গাড়ছে, ঋণের জালে বেঁধে ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রও ঘাঁটি গাড়বে, আরও ঋণ ছড়াবে।
দক্ষিণ এশিয়ার চলমান ঘটনাবলি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এই অঞ্চলের দেশগুলোর ক্ষমতাসীনরা জনগণের স্বার্থ, জাতীয় স্বার্থ, বিদেশি আগ্রাসন, সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ, রাজনীতিতে বৈদেশিক প্রভাব নিয়ে মোটেও চিন্তিত নন। তারা শুধু চান আরও দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে। এজন্য এমনকি দেশকে করদ করে দিতেও তারা পিছপা নন।
এমন পরিস্থিতি দীর্ঘ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এটাও স্মরণ রাখতে হবে যে, সমাজ ও রাজনীতির সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হলো জনগণ। পাল্টা সম্ভাবনা তাই সবসময়ই বিরাজ করে। বিপুল জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়তে পারেন। আর তাতে করে সমাধি রচিত হয়ে যেতে পারে প্রবল পরাক্রমশালী শাসকের, ধসে যেতে পারে পরাশক্তির পায়ের তলার ভিত। দেখা যাক, আমাদের ভাগ্যে কী রয়েছে!

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.