সংলাপেই সমাধান? -শুভ কিবরিয়া

Print Friendly and PDF

আসন্ন সংসদ নির্বাচনের প্রকৃতি নিয়ে জনমনে যখন উদ্বিগ্নতার ভাবনা প্রবল, তখন হঠাৎ করেই সংলাপের আয়োজন এক সুস্থিরতার সম্ভাবনা তৈরি করে। কিন্তু বাস্তবে সরকার ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ কোনোরকম সুখবর ছাড়াই শেষ হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কীভাবে হবে, কোন সরকারের অধীনে হবে, নির্বাচনকালীন সরকার কী হবেÑ ইত্যাকার প্রশ্নে শেখ হাসিনা এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিজ নিজ অবস্থানে এখনও অনড় আছে।
ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সহযোগে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যে ৭ দফা দাবি উপস্থাপন করে বাস্তবে তা হালে পানি পায়নি। অন্যদিকে সংবিধানের আওতায় দলীয় সরকারের অধীনে, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনের যে পদ্ধতির কথা শেখ হাসিনা বলছিলেন সেখানেই তিনি স্থির রয়েছেন। তাই আপাতত শেখ হাসিনার উদ্যোগে নেয়া রাজনৈতিক সংলাপ, আমাদের চলমান রাজনীতির সংকট সমাধানে প্রকৃতই কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।
তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সামনে কী হতে পারে?
এক. সরকার যেভাবে চাইছে সেভাবেই নির্বাচন হতে পারে।
দুই. সেই নির্বাচনে বিএনপিসহ অপরাপর দলগুলো অংশ নিতে পারে।
তিন. ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন করতে পারে।
চার. নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে দেয়া হতে পারে।
পাঁচ. রাজপথে সংঘাত-সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ছয়. নানা অছিলায় নির্বাচন পিছিয়ে যেতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা কী এই অনিশ্চয়তার ভার বইতে পারবে?

০২.
সংলাপ প্রশ্নে সরকারি দল কিছুটা নির্ভার। তারা ভাবছেন আলাপ-আলোচনার পরিবেশ উন্মুক্ত করে তারা এক ধরনের ইতিবাচক ভাবমূর্তি উপস্থাপন করতে পেরেছেন দেশে এবং আন্তর্জাতিক মহলে। একদিকে তারা ইতিবাচক পরিবেশে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন অন্যদিকে তাদের অবস্থান অনড় রেখে একাদশ সংসদ নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। দুই পথেই তারা লাভবান হচ্ছেন বলে ভাবছেন। আলাপ-আলোচনা চালিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো পথেই বর্তমান সংবিধানের আলোকে সরকারি দল যেমন নির্বাচনী পথে হাঁটছেন, ঠিক তেমনি প্রার্থী নমিনেশনসহ সকল নির্বাচনী আয়োজনেও তারা এগিয়ে আছেন।
এর ঠিক উল্টো অবস্থা বিএনপির। সরকারের সঙ্গে সংলাপের পর ঐক্যফ্রন্ট সন্তুষ্ট নয়। বিএনপি আরও অসন্তুষ্ট। বিএনপি বুঝতে পারছে সরকার তার হিসাবমতো, তার ভাবনা অনুযায়ীই নির্বাচনী পথে হাঁটছে। অন্যদিকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না পেয়ে, বেগম জিয়াকে কারাগারে রেখে, দ-িত তারেক জিয়াকে নির্বাসনে রেখে এক জটিল, অজানা, অস্থির, অশান্ত, ক্ষুব্ধ পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপির সামনে আসছে একাদশ সংসদ নির্বাচন। সরকার তার অনড় অবস্থান থেকে না সরলে, বিএনপি রাজপথে এই পরিস্থিতির সমাধানের জন্য সরকারের ওপর কতটা চাপ তৈরি করতে পারবে সেটাও পরিষ্কার নয়। এরকম অনিশ্চয়তাময় পরিবেশের মধ্যে নির্বাচনে যেতে হলে যে ন্যূনতম প্রস্তুতি থাকে, সেটাও যে বিএনপির আছে, তাও বলা যাবে না। সুতরাং নির্বাচনে গেলেও বিএনপি জনজোয়ার পক্ষে এনে তার ফল কতটা নিজের ঘরে নিতে পারবে সেটা খুবই অনিশ্চিত। অন্যদিকে, প্রতিকূল পরিবেশে নির্বাচন বর্জনের মতো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বিএনপির জন্য আত্মঘাতী। সেই পথে হাঁটা বিএনপির জন্য ডেকে আনবে আরও বড় বিপদ। এরকম পরিস্থিতিতে বিএনপি আন্দোলন এবং নির্বাচনী প্রস্তুতির পথে হাঁটবার উদ্যোগ নিচ্ছে।

০৩.
সংলাপ প্রথমদিকে যে গুরুত্বপূর্ণ চেহারা পেয়েছিল, ক্রমশ তা কিছুটা ফিকে হয়ে উঠছে। কেননা সরকার ইতোমধ্যে সকল প্রতিপক্ষ, সমপক্ষ দলের সঙ্গেই সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই সরকারের রাজনৈতিক অংশীজন জাতীয় পার্টি (এরশাদ) দলের সঙ্গে সংলাপ কী অর্থ বহন করে? এরশাদের সঙ্গে সাজানো-গোছানো সংলাপের প্রয়োজনীয়তাই বা কতটুকু? তাই, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই রাজনৈতিক সংলাপ, অনেকটা সমাবেশের আকার ধারণ করে তার গুরুত্ব হারিয়েছে। শাসক দলের পক্ষ থেকে এটা একটা কৌশলও হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক সংকটের প্রশ্নগুলো সমাধান না করে, সরকার তার ইচ্ছেমতো নির্বাচনের পথে হাঁটলে, তার ভবিষ্যৎই বা কী?

০৪.
এসব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, সরকার এই সংলাপের উদ্যোগ নিল কেন? বিএনপিই বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে সংলাপে অংশ নিতে গেল কেন? এর অন্তরালে, আন্তর্জাতিক কুশীলবদের কোনো ভূমিকা আছে কিনা? সম্প্রতি মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে যে ওলট-পালট এবং অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক পালাবদল চলছে, তাও বিবেচনার দাবি রাখে। এসব দেশে ভেতরে ভেতরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কুশীলবরা নানামুখীন ভূমিকা রাখছেন। সেটাই সেখানকার রাজনীতির চেহারা বদলে বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশেও কি সেরকম কিছু ঘটছে!

০৫.
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৭ দফা দাবি আদায়ে সরকারের সঙ্গে আরও ছোট পরিসরে সংলাপের দাবি করছে। নির্বাচনী তফসিল পিছিয়ে দেয়ার কথাও তারা বলছে। নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এসব দাবি তারা করছে। অন্যদিকে সরকার এসব দাবি না মানলে, জনমুখী প্রতিবাদের পথে হাঁটারও প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকার ৭ দফা দাবির বিষয়ে এখনও অনড়। কেননা, সরকারের ভাবনা, শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার অধীনেই সবাই নির্বাচনে আসতে বাধ্য হবে।
সরকার ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপির সমান্তরালে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে চাইছে। সুতরাং সামনের দিনে রাজনীতিতে এরশাদের জাতীয় পার্টি, বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট, ইসলামি দলগুলোর নানা জোট ও ফ্রন্ট নতুন নতুন চেহারায় আবির্ভূত হতে পারে। শুধু তাই নয়, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও ভাঙনের চেষ্টা চলতে পারে। বাড়তে পারে সরকারি পক্ষে ১৪ দলীয় জোটের পরিসরও।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিতে নানামুখী প্রবণতার উদ্যোগ, রাজনীতির বর্তমান চেহারা পাল্টেও দিতে পারে।

০৬.
তাহলে বাংলাদেশ কি আবার একটা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পথেই হাঁটবে?
অতীত বলে, সংলাপের পথে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক সংকট সমাধান পায়নি বরং সংলাপের পর পরই নানারকম অরাজনৈতিক ঘরানার মুখেই পড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে। এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণতর ভিন্ন। কেননা, বাংলাদেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন যে অভূতপূর্ব নির্বাচন হয় তার অভিজ্ঞতা ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবার পরও শক্তির জোরে এই সংসদ তার পূর্ণ মেয়াদ অতিক্রম করে। সরকারি দল ক্রমশ এক ব্যক্তির হাতে নিপতিত হয়। অন্যদিকে, মাঠের রাজনীতিতে ক্রমশ কোণঠাসা হতে হতে বিএনপি নেতৃত্বহীন হতে থাকে। তবে দল অটুট থাকে। বেগম জিয়া এবং তারেক জিয়ার অনুপস্থিতিতে একটা যৌথ নেতৃত্ব গড়ে ওঠে বিএনপিতে। সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে এই যৌথ নেতৃত্ব ড. কামাল হোসেনের মতো বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গেও রাজনৈতিক জোট তৈরি করতে সমর্থ হয়। এটা রাজনীতিতে একটা অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। একদিকে রাষ্ট্রশক্তির ওপর ভর করে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা আগামী সংসদ নির্বাচনে জনরায় নিজেদের অনুকূলে নিতে চাইছে। অন্যদিকে বেগম জিয়া, তারেক জিয়াবিহীন বিএনপি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দাবি আদায়ের সংগ্রামে রত হয়ে, তা আদায়সাপেক্ষে জনরায়কে নিজেদের পক্ষে টানতে চাইছে।
অতীতে এরকম রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করেনি বাংলাদেশ।
টানা দশ বছর নানাভাবে ক্ষমতায় থাকার পরও সরকারি দল ও তার মিত্ররা যথেষ্ট শক্তিশালী। আন্তর্জাতিক মহলের একটা বড় অংশের সমর্থন তাদের পক্ষে বলে দৃশ্যমান হচ্ছে। গণতন্ত্রের  বদলে উন্নয়নকে প্রাধান্য দেয়ার সেøাগানকে তারা জারি রাখতে সমর্থও হয়েছে।

০৭.
রাজনীতিতে শেষকথা বলে কিছু নেই। পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তনের অনেক ইঙ্গিতও দৃশ্যমান। যে আওয়ামী লীগ নেতারা নিত্যদিন ড. কামাল হোসেনসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের নিত্য বিষোদ্গার করতেন তারাই সংলাপে বসেছেন। প্রধানমন্ত্রী আরও সংলাপের সম্ভাবনাকে নাকচ করেননি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নতুন করে ছোট পরিসরে আরও কার্যকরী সংলাপের লিখিত আবেদন করেছে। নির্বাচন কমিশনকেও তফসিল ঘোষণা বিলম্বিত করার চিঠি দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। অন্যপক্ষে জনসভা করে লোক সমাগম দেখিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। সরকারও নানা উপায়ে নানা পক্ষের সমর্থন দেখিয়ে তার শক্তিমত্তা প্রদর্শন করতে চাইছে। নির্বাচনমুখর সম্ভাবনা তৈরি করার জন্য খালেদা জিয়ার কারামুক্তির নানান উপায় নিয়ে কথাবার্তা চলছে বলে আভাস মিলছে। সংকট ও সম্ভাবনা হাত ধরাধরি করে হাঁটছে।
হয়তো প্রতিদিনই তাই বদলে যাবে রাজনীতির প্রেক্ষাপট। বিবদমান পক্ষগুলো যে যার মতো জিততে চাইবে। কিন্তু শেষ হাসি কে হাসবে? বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার প্রকৃত গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের নিশানা খুঁজে পাবে কিনাÑ সেটাই এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।
তবে আশার কথা, বিবদমান পক্ষগুলো সংলাপের নামে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করেছে। এই আশাজাগানিয়া ঘটনাই এখন পর্যন্ত একটা সুলক্ষণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.