জাগছে কৃষক ঝুঁকছে জৈব সারে

Print Friendly and PDF

সৈয়দ রুমী, পাবনা থেকে

সারা দেশে কৃষক এক সময় গোবরের সার দিয়ে চাষাবাদ করত। খাদ্যের চাহিদা আর উৎপাদনের প্রতিযোগিতার মুখে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করতে শুরু  হয় রাসায়নিক সারের ব্যবহার । প্রথম দিকে রাসায়নিক সার ব্যবহারে যদিও অনীহা ছিল কৃষকদের। সে সময় কৃষি বিভাগ কৃষকদের রাসায়নিক সার ব্যবহারের পরামর্শ দিলে তারা ভর্ৎসনা করত। কৃষকরা মনে করত রাসায়নিক সার ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন করলে তাদের ছেলে মেয়েদের বিষ খাওয়ানো হবে। প্রয়াত কৃষিবিদ কাজী আতাউল হক বলেছিলেন, রাসায়নিক সারের প্রতি কৃষকদের আকৃষ্ট করার জন্য রাতের আঁধারে কৃষি  বিভাগ কৃষকদের আবাদকৃত ধানের এক পাশের কিছু জায়গায় ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দিয়ে আসতো। সপ্তাহখানেক পড়ে ওই কৃষকের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করা হতো একই জমির ধান এক পাশে ভালো সবুজ ও হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে-বাকি জমির ধান দুর্বল কেন? কৃষক সদুত্তর দিতে না পারায় তারা বলত জমির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য এখানে কিছু ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাতেই ধানের এ সুন্দর চেহারা হয়েছে। এ ধানে ফলনও বেশি হবে। সে থেকেই ধীরে ধীরে কৃষকের মাঠে রাসায়নিক সার প্রয়োগ শুরু হতে থাকে। কিন্তু মাটির জৈবশক্তির ক্ষমতা বিবেচনা না করে ইচ্ছামতো রাসায়নিক সার ব্যবহার করায় সাময়িক সুফল পেলেও দীর্ঘমেয়াদি সেটা মাটি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য কুফল বয়ে আনতে থাকে। সেদিক বিবেচনা করে যে ফসলগুলো জৈব সার ব্যবহার করে আবাদ করা সম্ভব; সে ফসলগুলো বর্তমানে জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমে আবাদ করার পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। আর এ জন্য মাঠপর্যায়ে চলছে প্রচার-প্রচারণা। হাতে নেয়া হয়েছে প্রকল্পও।
এক সময় কেঁচোকে বলা হতো কৃষকের বন্ধু আর জমির হাল চাষের হাতিয়ার ছিল লাঙ্গল। আবাদ করার পর মাঠে মাটি ভেদ করে কেঁচো মাটির ভেতরে চলে যেত। যাওয়ার সময় যে মল ত্যাগ করত সেটা জৈব সারের কাজ করত। এ ছাড়াও কেঁচোর গর্ত দিয়ে মাটির নিচে আলো বাতাস প্রবেশ করে ফসল উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা পালন করত। কিস্তু রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাঠ থেকে কেঁচো নিশ্চিহ্নপ্রায়। বর্তমানে কৃষি বিভাগের সহায়তায় প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ ব্যয় করে সেই কেঁচো কম্পোস্টের মাধ্যমেই তৈরি করছে জৈব সার। প্রাণীজ ও উদ্ভিদ বিভিন্ন ধরনের জৈব বস্তুর সমন্বয়ে বিশেষ প্রজাতির কেঁচোর সাহায্যে কম সময়ে জমিতে প্রয়োগ উপযোগী উন্নতমানের জৈব সার রূপান্তর করার পদ্ধতিকে বলা হয় ভার্মি বা কেঁচো কম্পোস্ট।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. আজাহার আলী জানান, সারা বিশ্বে ৪ হাজার ২০০’র বেশি প্রজাতির কেঁচো রয়েছে। তার ভেতর বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঁচ শতাধিক প্রজাতির কেঁচো দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে বৈজ্ঞানিকভাবে আইসেনিয়া ফিডিটা, ইউড্রিলাস ইউজেনি, পেরিওনিক্স ও ফেরেটিমা নামক চার প্রজাতির কেঁচো ব্যবহার করে জৈব সার তৈরি করা হয়ে থাকে। গবেষকরা মনে করে উন্নতমানের ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করতে ইউড্রিলাস ইউজেনি ও আইসেনিয়া ফিডিটা প্রজাতির কেঁচো ব্যবহারে ভালো ফল পাওয়া যায়।
 জৈব সার তৈরি ও উদ্বুদ্ধ করার জন্য পাবনার সুজানগর থানার দুলাই দক্ষিণপাড়ায় সম্প্রতি এক কৃষক সমাবেশের আয়োজন করে কৃষি বিভাগ। ন্যাশনাল এগ্রিকালচার টেকনোলজি প্রোগ্রাম বা এনএটিপি দ্বিতীয় পর্যায়ের আওতায় ওই সমাবেশে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো কম্পোস্টের মাধ্যমে জৈব সার উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ সমাবেশে পাবনা কৃষি সম্প্রসারণের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আজাহার আলী বলেন, বৈরী আবহাওয়া ও বিরূপ জলবায়ুর প্রভাবে আমাদের কৃষি উৎপাদনকে টিকিয়ে রাখতে হলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার পরিহার করা সম্ভব নয়। তবে অপরিকল্পিত সার ব্যবহার থেকে কৃষকদের সরে আসতে হবে। ধান-পাট-গম ছাড়া যে ফসল জৈব সার দিয়ে উৎপাদন করা সম্ভব, সে ফসল জৈব সারের মাধ্যমে উৎপাদন করে মাটির উর্বরতা শক্তি টিকিয়ে রাখতে হবে। পাবনা জেলাতে বর্তমানে ব্যাপক হারে সবজির আবাদ হচ্ছে। এ সবজি আবাদ জৈব সার দিয়ে করা সম্ভব। তাতে ফলনের কোনো তারতম্য হবে না। জমির উর্বরা শক্তিও বৃদ্ধি পাবে। শীতকালীন সবজি, ডাল জাতীয় ফসল ও রবি মৌসুমে আবাদকৃত অন্যান্য ফসলের জন্য জৈব সার অত্যন্ত কার্যকরী বলে জানান এ কৃষিবিদ।
ভার্মি বা কেঁচো কম্পোস্টের মাধ্যমে জৈব সার তৈরি কারক চাষি শাহীন জানান, এ সার তৈরি করতে প্রথমে একটি ছোট চেম্বার তৈরি করতে হয়। এ চেম্বারের মধ্যে গোবর, মাটি, তরিতরকারির ফেলে দেয়া অংশ, ফলমূলের খোসা, পশুপাখির নাড়িভুঁরি, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, খড়কুটা ও আবর্জনা দিয়ে তার ভেতরে লাল প্রজাতির কেঁচো দিতে হয়। গোবর, মাটি ও আবর্জনা খেয়ে ওই কেঁচো যে মল ত্যাগ করে সেটা চেম্বারের অন্যান্য দ্রব্যের সঙ্গে মিশে জৈব সার তৈরি হয়ে থাকে।  সবজি জাতীয় ফসলে এ সার ব্যবহার করে ফল পাওয়া গেছে। সবজি উৎপাদনে ফলন ভালো হয়েছে। প্রতি মাসে প্রতিটি চেম্বার থেকে ১৫ থেকে ২০ কেজি জৈব সার উৎপন্ন করা হয়ে থাকে।
আটঘড়িয়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ প্রশান্ত কুমার সরকার জানান, রাসায়নিক সার ব্যবহারে নির্দিষ্ট মাত্রা রয়েছে। রয়েছে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও। কিন্তু জৈব সার প্রয়োগে কোনো নির্দিষ্ট মাত্রা নেই। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই। এ সার বেশি দিলে জমির কোনো ক্ষতি হবে না। বরং উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পাবে। ভূগর্ভে পানির ধারণ ক্ষমতা বাড়ে, সেচের পানির ব্যবহার হ্রাস পেয়ে থাকে। এ ছাড়াও রাসায়নিক সারের বদলে জৈব সার ব্যবহার করলে ফসলে রোগ, পোকামাকড়ের উপদ্রব কম হয়। অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে ফলন বেশি হয়। রাসায়নিক সারের তুলনায় খরচ অত্যন্ত কম। জৈব সার রাসায়নিক সারের সম্পূরক হিসেবে কাজ করে থাকে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. লোকমান হোসেন বলেন, পাবনা জেলার নয়টি উপজেলাতে এনএটিপি ফেজ-২ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ১২৯টি ভার্মি কম্পোস্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এ কম্পোস্ট থেকে উৎপাদিত জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমে সবজি, ডাল ও রবি মৌসুমে আবাদকৃত বিভিন্ন ফসল আবাদ করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছে। সে সঙ্গে জমির জৈবশক্তি অক্ষুণœ থাকছে।
আমাদের সারা দেশের কৃষক জমির প্রাকৃত উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে এবং বর্তমানে এবং আগামী প্রজন্মের
সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে জৈব সার বান্ধব চাষাবাদের মাধ্যমে বিষমুক্ত খাদ্যর উৎপাদনে এগিয়ে আসুক; সেই সঙ্গে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের খাদ্য হয়ে উঠুক নিরাপদ ও নির্ভেজাল। এমনই প্রত্যশা সকলের।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

দেশজুড়ে
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.