জোটের রাজনীতি দেশে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব সৃষ্টি করেছে

Print Friendly and PDF

ই তা লি

পলাশ রহমান

বাংলাদেশে জোটের রাজনীতি শুরু হয় মূলত ১৯৯৬ সালের পর থেকে। এর আগে রাজনৈতিক দলগুলো এককভাবে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ৩০.০৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল এবং আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৩০.০১ শতাংশ ভোট। সে সময়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছিল জামায়াতের সমর্থন নিয়ে।
৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পায় ৩৭.০৪ শতাংশ ভোট এবং বিএনপি পায় ৩৩.০৬ শতাংশ ভোট। এর পর থেকে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আর কখনো এককভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। তারা জোট মহাজোটের রাজনীতি শুরু করে।
বাংলাদেশে জোট রাজনীতির শুরুতেই খুব সচেতনভাবে মানুষের মস্তিষ্কে গুঁজে দেয়া হয়- জোট রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই। ক্ষমতায় যেতে হলে, দেশ শাসন করতে হলে জোটের রাজনীতি করতে হবে। জোটভিত্তিক নির্বাচনই সময়ের সঠিক উপলব্ধি। ক্ষমতার ভাগাভাগি বা অংশিদারিত্বের জন্য জোটভিত্তিক নির্বাচনই সর্বোত্তম পদ্ধতি।
ধীরে ধীরে দেশের মানুষ এবং ক্ষমতার পানি গ্রহণে আগ্রহী রাজনীতিকরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে নিয়েছেন, জোটের রাজনীতি বা জোটভিত্তিক নির্বাচনই রাজনৈতিক সফলতার একমাত্র সূত্র। ফলাফল আমরা দেখেছি, দেখছি ৯৬ সালের পর থেকে দেশে ব্যাপক আকারে জোটের রাজনীতি শুরু হয়েছে। ছোট এবং মাঝারি দলগুলো দুইভাগে বিভক্ত হয়ে আওয়ামী লীগ বিএনপির সঙ্গে জোটভিত্তিক নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, নিচ্ছে।
জোট রাজনীতির ফলে মূলত আওয়ামী লীগ বিএনপির মনোপলি রাজনীতির ভিত শক্ত হয়েছে। তাদের ক্ষমতা সুসংহত হয়েছে। ছোট এবং মাঝারিগোছের রাজনৈতিক দলগুলো তারা ভাগাভাগি করে নিতে সক্ষম হয়েছে। এখন দেশে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিকল্প কোনো রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বড় দুই দল কৌশলে অন্য দলগুলোকে তাদের জালে আটকে ফেলেছে। জোট গঠনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-বিএনপি আদর্শগত কোনো বাছবিচার করেনি। তাদের মূল টার্গেট হলো দেশে যেন অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।
আমরা দেখেছি ছোট এবং মাঝারি রাজনৈতিক দলগুলো আওয়ামী লীগ-বিএনপির জালে অসহায়ের মতো ধরা দিয়েছে। তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ বা চিন্তাধারা শিকায় তুলে আওয়ামী লীগ-বিএনপির দলীয় আদর্শ মেনে নিয়েছে। এমনকী নির্বাচনের সময়ে নিজ দলের প্রতীক বাদ দিয়ে নৌকা-ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করতেও তারা দ্বিধা করেনি। আওয়ামী লীগ বিএনপির কড়া সমালোচকরাও এখন তাদের অনুগত হয়ে গিয়েছে। অতীতের রাজনৈতিক হিরোরাও সারা বছর হাত গুটিয়ে বসে থাকেন। নির্বাচন এলে তারা জোটের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। অর্থাৎ জোটের রাজনীতি দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল বা আদর্শকে দেউলিয়া করে ফেলেছে। দেশের স্বাভাবিক রাজনীতিকে প্রাণহীন করে ফেলেছে। সবাই বিশ্বাস করে নিয়েছে আওয়ামী লীগ বিএনপির বিকল্প সৃষ্টি করা বা তাদের গ-ি ভাঙা সম্ভব নয়। সুতরাং ঘুরেফিরে আওয়ামী লীগ-বিএনপির দুঃশাসনের কাছে ফিরে যাওয়াই স্বাধীন বাংলাদেশের নিয়তি।
জোট রাজনীতির এই অনৈতিক সফলতা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। তারা এখন একদলীয় শাসনের পথে হাঁটছে। তারা দেশের মানুষের সামনে উন্নয়নের মুলা ঝুলিয়ে বিরোধী দল নির্মূল এবং বিরোধীমত দমনে সর্বশক্তি, মেধা নিয়োগ করেছে। তারা নিজেদের ইচ্ছা মতো সংবিধান পরিবর্তন করেছে। অনির্বাচিতদের নিয়ে জাতীয় সংসদ পরিচালনা করেছে, করছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনেও অনির্বাচিতদের সংসদ বহাল রাখার ঘোষণা দিয়ে অবাধ নির্বাচনের কফিনে গজাল ঠুকে দিয়েছে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো- আওয়ামী লীগ বা বিএনপির একক ভোট অথবা সমর্থন কোনোভাবেই ২০ থেকে ২৫ শতাংশের বেশি নয়। কারণ ৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৩০.০১ শতাংশ ভোট এবং বিএনপি পেয়েছিল ৩০.০৮ শতাংশ ভোট। ৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছিল ৩৩.০৬ শতাংশ ভোট এবং আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৩৭.০৪ শতাংশ ভোট। এই ভোটের সব যে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির রিজার্ভ ভোট তা তো নয়। দুই দলের প্রাপ্ত ভোটের অন্তত ৭ থেকে ১০ শতাংশ ভোট ভাসমান ভোটারদের। তারা কোনো দলের দাসত্ব করে না। যখন যাকে ভালো মনে করে বা এ দলের দুঃশাসন থেকে সৃষ্ট ঘা শুকাতে অন্যদলকে ভোট দেয়। সুতরাং বাংলাদেশের মোট ভোটারের অর্ধেকেরও কম ভোটারের প্রতিনিধিত্ব করে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। বাকি অর্ধেকেরও বেশি ভোট বা ভোটারদের সমর্থন নিয়ে যাতে দেশে বিকল্প কোনো রাজনৈতিক দল বা শক্তি গড়ে উঠতে না পারে সে জন্যেই এত ব্যাপকভাবে জোট রাজনীতির বিস্তার ঘটানো হয়েছে। কৌশলে মানুষকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করা হয়েছে জোট রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই বা আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে অন্য কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় নেই।
দেশের মানুষ এবং রাজনীতিকরা এখন আর আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিকল্প চিন্তা করে না। অথচ জোট রাজনীতির বাইরে গিয়ে যদি রাজনৈতিক দলগুলো এককভাবে নির্বাচন করত এবং প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে সংসদ গঠন করত তবে বড় দুই দলের একচ্ছত্র আধিপত্য কমতে পারত। তাদের অজবাবদিহি মনোভাব এবং দুঃশাসনে পরিবর্তন আসতে বাধ্য হতো।
জোটভিত্তিক নির্বাচন না করে যদি ভোটের পরে সমর্থন বা আস্থার ভিত্তিতে সরকার গঠন হতো তবে সরকার ক্ষমতার অপব্যবহার করার সুযোগ পেতো না। রাজনৈতিক দস্যুপনা করতে পারত না। নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি বা পোক্ত করার জন্য অনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধাগ্রস্ত হতো। সরকার সংসদে আস্থাহীনতায় পড়ার ভয়ে থাকত। ছোট এবং মাঝারি দলগুলো দেশ শাসনে সত্যিকারের ভূমিকা রাখতে পারত। বড় দলের কাছে নিজেদের অসহায় মনে করত না। নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটাতে পারত। রাজনীতিতে প্রাণ থাকত। সরকার বিরোধী দলকে উপেক্ষা করে সংবিধান পরিবর্তন করতে পারত না। অনির্বাচিতদের নিয়ে সংসদ চলত না। জনমত উপেক্ষা করে সরকার ইভিএম চাপিয়ে দিতে পারত না। অর্থনৈতিক লুটতরাজের জবাবদিহি করতে হতো। সরকারের প্রধান দল এবং সমর্থক দল উভয়ই অধিক হারে জনদায় অনুভব করত।
জোট কালচারের বাইরে নির্বাচন হলে মানুষ দুই দলের বিকল্প চিন্তা করার সুযোগ পেতো। দলভিত্তিক আদর্শ এবং শাসন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে বাধ্য হতো। ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হতো। ছোট এবং মাঝারি দলগুলো তাদের মতো করে চিন্তা করতে পারত এবং দেশের জনগণ তাদের চিন্তাধারা যাচাই করার সুযোগ পেতো।
জোটভিত্তিক রাজনীতি না হলে সকল রাজনৈতিক দল সারা বছর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকত। সরকারের অনৈতিক কাজের চতুর্মুখী সমালোচনার সুযোগ সৃষ্টি হতো। রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের দক্ষতা যোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা করতেন। আত্মবিশ্বাসী হতেন।
জোটের রাজনীতি না থাকলে ছোট মাঝারি দলগুলো নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখত। জনগণের প্রতি তারা বেশি দায়িত্ববান হতো। দেশের মানুষের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি পেতো। স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে পারত। সংসদে এবং সংসদের বাইরে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারত। নিজস্ব চিন্তা এবং আদর্শ জাতির সামনে প্রকাশ করার সুযোগ পেতো।
জোটের রাজনীতি না থাকলে বড় দুই দলের মহাজনী মনোভাব কমতে পারত। অঞ্চলভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হতো। দেশে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব সৃষ্টি হতো না। রাজনৈতিক নেতারা আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে পড়তেন না। বড় দুই দলের কাছে অসহায়বোধ করতেন না। সরকার গঠনের ক্ষেত্রে ছোট এবং মাঝারি দলগুলোরও গুরুত্ব ভূমিকা থাকত। তারা সরকারে থেকেই সরকারের অনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতি সংসদে অনাস্থা জানাতে পারত। দেশ শাসনের ক্ষেত্রে দুই দলে গণতন্ত্রের নামে ব্যক্তিশাসন কমতে বাধ্য হতো। দেশের মানুষ সত্যিকারের গণতন্ত্রের স্বাদ গ্রহণ করতে পারত। দেশের উন্নয়ন এবং জবাবদিহিতা হাতধরাধরি করে চলতে পারত।
palashrahman@yahoo.com

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রবাসে
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.