শিনজে আবে ও শি জিনপিং বৈঠক মিলনের সূত্রপাত না বিরোধের অবসান!

Print Friendly and PDF

সাইমন মোহসিন

প্রায় সাত বছর পর জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজে আবে চীনে দ্বিপক্ষীয় সফর করেন গত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে। সফরের কারণ, চীন-জাপান শান্তি ও সৌহার্দ্য চুক্তির ৪০তম বার্ষিকী উদ্যাপন। তবে, এই সফরের মাধ্যমে গত প্রায় এক বছরের চীন-জাপান সম্পর্কোন্নয়ন ও পারস্পরিক আচরণে সমন্বয়বিধানের প্রচেষ্টার ইতিবাচক ফলাফলই ব্যক্ত হয়েছে।
এই প্রচেষ্টা প্রক্রিয়া উভয়পক্ষে বাস্তববাদিতা ও পারস্পরিক স্বার্থতাড়িত। এশিয়ার অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী তত্ত্বের টানাপড়েন অব্যাহত রয়েছে এই মহাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি শক্তির মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী আবে এবং চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং, উভয়ের শাসনকালে এই দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ঐতিহাসিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ প্রকটভাবে লক্ষ্য করা গিয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অত্যন্ত বাজে অবস্থায় পৌঁছায় ২০১০ সালে যখন জাপানের কোস্ট গার্ডের নৌযানের গায়ে চীনের একটি ট্রলার বাড়ি খেয়ে আঘাত করে। ঘটনাটি ঘটে সেনকাকু দ্বীপঘেরা সাগর অঞ্চলে। চীন ও জাপান উভয়েই এই দ্বীপের দাবিদার। এমন অবস্থায় দুই দেশের মধ্যে সংলাপবিহীন রাজনৈতিক টানাপড়েন অব্যাহত থাকে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলো, দু’দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্রমাগত আরও শক্তিশালী হতে থাকে। এই দুই দেশের ক্রমান্বয়ে পরস্পরনির্ভর অর্থনীতি রাজনৈতিক টানাপড়েনের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।
শিনজে আবের সফর জাপান-চীন সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পরিষ্কার ইঙ্গিত বহন করছে। দুই দেশের নেতৃবৃন্দ বিশ্বে ক্রমবর্ধমান রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার অঙ্গীকার করেন। বেইজিং জাপানের নেতাকে সমাদরে স্বাগত জানায় এবং শি জিনপিংও শীঘ্রই জাপানে সফরের কথা জোর বিবেচনা করছেন।
এই দুই নেতার রক্ষণশীল মনোভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার পেছনে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র দায়ী। স্মৃতিকালে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সবচেয়ে সংহতিনাশক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বললে ভুল হবে না। গত প্রায় অর্ধশতাব্দীব্যাপী পূর্ব এশিয়ার অসাধারণ অর্থনৈতিক প্রগতির প্রভাবক নীতি, কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে দুর্বল করতে যেন ব্যস্ত ট্রাম্প। ট্রাম্প আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর পরই ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ থেকে সরে দাঁড়ান। ক্রমান্বয়ে তার পদক্ষেপগুলো পূর্ব এশিয়ায় হিতে বিপরীত হতে থাকে। ব্যবসায়ী হিসেবে এবং এখন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প সবসময়ই বলে এসেছেন যে বিশ্বায়নের ফলে অন্যরা যুক্তরাষ্ট্রকে অপব্যবহার করার সুযোগ পেয়ে গেছে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত নীতিসমূহ বাতিল করা উচিত বলেই তার বিশ্বাস।
ট্রাম্পের রোষানলে পড়েছে জাপান, কোরিয়া ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কিন্তু লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে চীন। ট্রাম্প প্রশাসন পুরোদমে চীনের পেছনে উঠে পড়ে লেগেছে। চীনের ওপর আরোপিত করসমূহ প্রশান্ত অঞ্চলজুড়ে একটি বাণিজ্যিক যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
চীনের বিরুদ্ধে জাপান এবং অন্যান্য বড় রপ্তানিকারক অর্থনীতিগুলোর ক্ষোভ ও অভিযোগের কোনো শেষ নেই। বিশ্ববাণিজ্য চর্চা ও নীতি বিবেচনায় এই অভিযোগগুলো অনেকাংশেই সঠিক। কিন্তু চীন এখন বিশ্বের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক রাষ্ট্র। জাপান ও অন্যান্য বৃহৎ রপ্তানিকারক অর্থনীতিগুলো চীনের বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এই বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বে খেসারত তারা দিতে নারাজ।
ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যিক প্রকোপ জাপানকে চিন্তিত করে তুলেছে। জাপানের রপ্তানিপণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের করারোপ এবং জাপানের ওপর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য চাপ সৃষ্টি, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি বাতিলের নিশ্চয়তা ব্যতীতই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এককভাবে সংলাপ ও আরও অনেক বিষয় টোকিও’র জন্য বিশাল উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার কারণে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা জাপানের জন্য প্রাধিকার। এখন পর্যন্ত শিনজে আবে যুক্তরাষ্ট্রের সকল আঘাত মুখ বুজে সহ্য করেছেন। রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জন্য সেগুলো সহ্য করা সহনীয় হলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিষয়টা অনেকটাই অপমানজনক হওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক জাপানের জন্য অপরিহার্য হলেও, ট্রাম্পের নীতিগুলোর জন্য সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ যাতে হ্রাস করা যায়, শিনজে আবে সে চেষ্টাই করছেন। একইসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়াও যে শিনজে জাপানের স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম সেটা প্রদর্শন করতেই চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন, এমনটাই বলছেন জাপানি বিশেষজ্ঞগণ।
জাপান আর চীন এশিয়ার অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার বিবেচনা করতে পারে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্রনীতি কৌশলের প্রতিপাদ্য হিসেবে বিবেচিত। প্রায়ই তাদের বেছে নেয়া পন্থা হয়তো একই নয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই পার্থক্য দূর করা অসম্ভব কিছু নয়। আর সেসব ক্ষেত্রে সরাসরি দ্বন্দ্ব যৌক্তিক নয়, সে কথা দুই দেশের নীতিনির্ধারকগণ উপলব্ধি করতে পারছেন।
টোকিও আর বেইজিং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি) বাস্তবায়নে সচেষ্ট। এই বহুপক্ষীয় চুক্তি এশিয়ার সকল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের একই কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করবে। দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে চীন-জাপান-দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্যিক এলাকা স্থাপন বিষয়ক আলোচনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
আবে এবং শি দুজনই বহুপক্ষীয় বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার পক্ষপাতি। এই কাঠামো দুই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো সহায়ক। দুই দেশের মধ্যে আরও সমন্বিত, প্রসারিত ও শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক কি বিশ্বমঞ্চে এই বহুপক্ষীয় প্রক্রিয়ার সহায়কা হবে কিনা সেটাও নির্ধারণ করতে আগ্রহী এই দুই নেতা। তারা দুজনই উপলব্ধি করেন যে জাপান-চীন সম্পর্ক এতই বড় যে এই সম্পর্ক ব্যর্থ হবে এমন সম্ভাবনারই সূচনা হতে দেয়া যাবে না।
জাপানের পররাষ্ট্রনীতি বিবেচনায় এই উদ্যোগকে অনেকেই সঠিক দিকনির্দেশনা হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। কিন্তু চীনের সঙ্গে এই সম্পর্কোন্নয়ন চীনের চেয়ে জাপানের জন্যই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকিটা হলো এই সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে জাপানের অন্যান্য মিত্রদের মধ্যে জাপান সম্বন্ধে ধারণা। জাপানের মতো ইউরোপের প্রায় সকল রাষ্ট্রই চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে একাই দ্বন্দ্বে এগিয়ে যেতে দেখতে আগ্রহী। তারা মূলত এই দ্বন্দ্বের ফলে সৃষ্ট সমস্যা ও ক্ষতি থেকে গা বাঁচিয়ে সুফলটুকু (যদি থাকে) লাভেই আগ্রহী।
জাপানের এই প্রচেষ্টা তাদের মনে প্রশ্ন তুলতে পারে জাপান কি চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে কিনা। একই সঙ্গে এশিয়ার অন্যান্য, বিশেষ করে ছোট রাষ্ট্রগুলো যদি মনে করা শুরু করে যে জাপান চীনের কাছে নতজানু হয়ে পড়ছে, তাহলে সেটা এই মহাদেশে ভিন্ন এক পরিস্থিতির উদ্ভব করতে পারে।
বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত শি জিনপিং ও শিনজে আবের বৈঠক পারস্পরিক স্বার্থ এবং একই কৌশলগত নীতিতে এই দুই রাষ্ট্র সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারবে কিনা সেটা অনেকটাই যাচাই করতে পেরেছেন তারা। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে এই বৈঠকের ফলাফল কী হয় সেটা সাইডলাইনে বসে পর্যবেক্ষণ করছে ট্রাম্প প্রশাসন। এশিয়া মহাদেশের জন্য জাপান-চীন সম্পর্ক কি নতুন কোনো সমস্যা বয়ে আনবে নাকি আপামর এশিয়ার জন্য সুসংবাদ বয়ে আনবে সেটার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

দেশের বাইরে
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.