বড়পুকুরিয়া খনি উধাও কয়লার পরিমাণ কত?

Print Friendly and PDF

ওমর ফারুক

বিভিন্ন খবরের কাগজের সাম্প্রতিক নানা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে মজুদ কয়লা গায়েব হয়ে গেছে (যুগান্তর ২১ জুলাই; ডেইলি স্টার ২১ জুলাই; প্রথম আলো ২৩ জুলাই; বিবিসি বাংলা ২৮ জুলাই)। কোল ইয়ার্ডে খনি কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী জমা থাকা কয়লা না থাকায় খনি সংলগ্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করতে হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী কোল ইয়ার্ডে ১,৪৪,০০০ মেট্রিক টন কয়লার সন্ধান মিলেনি। কয়লা মজুদের পরিমাণ সম্পর্কিত এ তথ্যের উৎস হচ্ছে পেট্রোবাংলা/জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দেয়া বক্তব্য। কিন্তু এর সঙ্গে খনি কোম্পানির দালিলিক তথ্যের ব্যাপক গরমিল দেখা যায়। ফলে প্রশ্ন জাগে বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উধাও হওয়া কয়লার আসল পরিমাণ কত?

২.
বড়পুকুরিয়া খনি কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভায় উত্থাপিত প্রতিবেদনে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের খনি সংক্রান্ত সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়। ২০১৭ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে সমাপ্ত অর্থবছরের উৎপাদিত কয়লার পরিমাণ, বিক্রি করা কয়লার পরিমাণ এবং উদ্বৃত্ত (মজুদ) কয়লার পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে দেখা যায়, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে (১ জুলাই ২০১৬ থেকে ৩০ জুন ২০১৭) মোট কয়লা উৎপাদিত হয়েছে ১১.৬১ লাখ মেট্রিক টন। এর সঙ্গে আগের অর্থবছরের মজুদ কয়লা যোগ করা হয়েছে। সর্বমোট মজুদ কয়লা থেকে ৫.৪১ লাখ মেট্রিক টন বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিক্রি করা হয়েছে এবং ৪.৫২ লাখ মেট্রিক টন দেশীয় অন্যান্য ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। এ হিসাব মতে ঐ অর্থবছরে (৩০ জুলাই ২০১৭ পর্যন্ত) উদ্বৃত্ত কয়লার পরিমাণ ১.৬৮ লাখ মেট্রিক টন। এর সঙ্গে যুক্ত হবে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের (১ জুলাই ২০১৭ থেকে ৩০ জুন ২০১৮) মজুদ কয়লা; কেননা কয়লা উধাও হওয়ার বিষয়টি জানা গেছে যখন ২০১৮ সালের জুলাই মাসে জ্বালানি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে অনুসন্ধান করেছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে সংবাদপত্রে প্রকাশিত গায়েব হওয়া কয়লার পরিমাণের সঙ্গে খনি কোম্পানির দলিলে বর্ণিত তথ্যের মিল নেই।

৩.
এ তো গেল শুধু এক অর্থবছরের হিসাবের কথা। উক্ত বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য থেকে আরও গরমিল দেখা যায়।  ২০১৭ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বর্ণিত হিসাব অনুযায়ী জুন ২০০৪ থেকে জুন ২০১৭ পর্যন্ত সময়কালে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৮ মেট্রিক টন কয়লা উদ্বৃত্ত (স্টক) আছে (দেখুন পৃষ্ঠা - ৩৬)। খনি কোম্পানির এ বার্ষিক প্রতিবেদন মতে ৩০ জুন ২০১৭ তারিখে মোট উদ্বৃত্ত কয়লার পরিমাণ ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৮ মেট্রিক টন হলেও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ২০১৮ এর জুলাই মাসের মাঝামাঝিতে সম্পন্ন হওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে উদ্বৃত্ত কয়লার পরিমাণ বলা হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ মেট্রিক টন এবং এ পরিমাণ কয়লাখনির ইয়ার্ডে পাওয়া যায়নি। এ পরিমাণ কয়লার আনুমানিক বাজার দর ২৩০ কোটি টাকা (বিবিসি বাংলা, ২৬ জুলাই)। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এ অনুসন্ধানের পরই গণমাধ্যমে কয়লা গায়েবের খবর প্রচারিত হয়। প্রশ্ন জাগে- বাকি ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টন কয়লা কোথায় গেল? এর সঙ্গে যদি ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের মজুদ কয়লা যোগ করা হয় তাহলে উদ্বৃত্ত (স্টক) কয়লার পরিমাণ আরও বেশি হবে। গণমাধ্যমে প্রচারিত মন্ত্রণালয়ের দেয়া হিসাবের সঙ্গে খনি কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনের হিসাবে এত ফারাক কেন?

৪.
জ্বালানি মন্ত্রণালয় বড়পুকুরিয়া খনি কোম্পানিকে একটি দক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করে আসছে বলেই মনে হয় কেননা, এ কোম্পানিকেই দীঘিপাড়া কয়লাখনি উন্নয়নের দায়িত্ব দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর দক্ষতার চিত্র আশাব্যঞ্জক কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কয়লা গায়েবের বিষয়টি সমস্যার উপরিভাগের চিত্রকেই তুলে ধরে। এ থেকে কোম্পানির কয়লা বিষয়ক হিসাব-নিকাশের কর্মদক্ষতার চিত্র ফুটে ওঠে মাত্র। অথচ সমস্যার ব্যাপ্তি আরও বড়। ২০১৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে দেশে কয়লার চাহিদা মেটানোর জন্য বড়পুকুরিয়া খনি কোম্পানি বিদেশে কয়লা খনি লিজ নিয়ে কয়লা সরবরাহ করতে পারে কিনা তা যাচাই করার জন্য নির্দেশ দেন। ২০১৫ সালের ৯ এপ্রিলেও তিনি একই নির্দেশ দেন। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন ৯০ এর দশকের শুরুতে প্রতিষ্ঠিত এ কোম্পানি নিশ্চয়ই এ কাজ পারবে। প্রধানমন্ত্রীর উভয় নির্দেশের অগ্রগতি সম্পর্কিত জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে (৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭) বলা হয়েছে ‘বিদেশি বিশেষজ্ঞগণের সহায়তা ব্যতীত স্বাধীনভাবে কয়লা অনুসন্ধান ও উৎপাদনের অভিজ্ঞতা এ কোম্পানির নেই। ... প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জনের পর এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ এ বিষয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য আরও শঙ্কা তৈরি করে। ২০১৬ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে বড়পুকুরিয়া খনি কোম্পানি গত দশ বছরে যা অর্জন করেছে তা দিয়ে এটা বলা যাবে না যে এই কোম্পানি স্বাধীনভাবে বড়পুকুরিয়া খনির দায়িত্ব নিতে পারবে বা নতুন কোনো খনি যেমন- দীঘিপাড়া তৈরি করতে পারবে। এ কাজের জন্য নিজস্ব দক্ষ জনশক্তিও সক্ষমতা তৈরির বিষয়ে বড়পুকুরিয়া খনি কোম্পানির কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই নেই। অথচ সেই ৯০ এর দশকের শুরুতে ব্রিটিশ কোম্পানি ওয়ার্ডেল আর্মসট্রং এবং খনির চীনা ঠিকাদার কোম্পানি (সিএমসি) দেশীয় মানবসম্পদ তৈরিতে বিশেষ তাগিদ দিয়েছে। কয়লা গায়েবের খবরে সরকার নড়েচড়ে বসছে বলে মনে হচ্ছে। এ সুযোগে যদি বড়পুকুরিয়া খনি কোম্পানি সম্পর্কে ব্যাপক বিচার বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে দেশের মূল্যবান খনিজসম্পদের ব্যবহার নিয়ে আরও ভালো পরিকল্পনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

৫.
ওপরের বর্ণনা থেকে দুটি বিষয় পরিষ্কার ফুটে ওঠে। ক) বড়পুকুরিয়া খনি কোম্পানির দলিল দস্তাবেজে ব্যাপক ফাঁকি আছে। এসবের চুলচেরা বিশ্লেষণ দরকার; জাতীয় স্বার্থে স্বাধীন কোনো নিরীক্ষক দিয়ে ২০০৪ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি সব হিসাব-নিকাশের বিশ্লেষণ প্রয়োজন। খ) বড়পুকুরিয়া খনি কোম্পানি কি শুধু বিদেশি ঠিকাদার কোম্পানির ব্যবস্থাপক হয়েই থাকবে, নাকি একটি স্বাধীন খনি কোম্পানি হিসাবে গড়ে উঠবে?
লেখক : প্রাক্তন সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সাপ?তাহিক পতিবেদন

বিশ্লেষন
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.