মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : বিএনপির দুঃসময়ের কাণ্ডারি -আনিস রায়হান

Print Friendly and PDF

বলা হয়, এমনও সময় আসে, যখন ইতিহাস মানুষের কাঁধে সওয়ার হয়। ব্যক্তি তার কাজ দিয়ে মানুষের মাঝে অবস্থান তৈরি করেন। এরপর ‘নির্দিষ্ট সময়’ আসে, সেই সময়ের প্রয়োজনে মানুষ ব্যক্তির কাঁধে দায়িত্ব অর্পণ করে। একটা পর্যায়ে দেখা যায়, সেই ব্যক্তির ভুল কিংবা সঠিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে ইতিহাসের পরিণতি। এটাকেই বলে মানুষের কাঁধে ইতিহাসের সওয়ার হওয়া।
মির্জা ফখরুল এখন সেই মানুষ- বিএনপির তো বটেই, দেশের ইতিহাসের গতিপথও এখন যে কয়েকজন মানুষের ওপর নির্ভর করছে, তিনি তার মধ্যে অন্যতম। তার সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্ব দানের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে বিএনপি ও তার লাখো সমর্থকদের ভাগ্য। আর বিএনপি দেশের প্রধান দুই দলের একটি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের রাজনীতির আশু ভবিষ্যৎও।
বিএনপি তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুঃসময় পার করছে এখন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলের মূল নেতৃত্ব সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরিবারের হাতে থাকলেও এ মুহূর্তে প্রত্যক্ষভাবে তারা কেউ দলের নেতৃত্বে নেই। খালেদা জিয়া কারাগারে, আর তারেক রহমান রয়েছেন দেশের বাইরে।
দলটির সিনিয়র নেতারাও অনেকে কারাগারে আছেন। মামলা, গ্রেপ্তার তো সইতে হচ্ছে দলের অধিকাংশ নেতাকেই। ২০০৬ সালের ১/১১ পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে দলটির নেতৃবৃন্দ বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই এগোচ্ছে। দলটির জন্য এমন এক চরম দুঃসময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
এই নির্বাচন বিএনপির জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে দলটিকে আরও শোচনীয় অবস্থায় পড়তে হবে। এরকম সময়ে দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার সামনে সহস্র চ্যালেঞ্জ। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দলের ঐক্য ধরে রাখা এবং নির্বাচনে জয়ী হওয়া। তিনি কি পারবেন?

২.
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিচ্ছন্ন রাজনীতির মানুষ। বড় দুই দলে সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ, ষড়যন্ত্র-চক্রান্তকারী, আমলা, ব্যবসায়ী, রাজকারদের মতো বিতর্কিত নেতৃত্বের ভিড় ঠেলে সুস্থ ধারার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনৈতিক নেতা খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। মির্জা ফখরুল সেই গুটি কয়েকের একজন। ভদ্রতা, নম্রতা ও মার্জিত সংস্কৃতির জন্য রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরোধীদের কাছেও প্রশংসিত তিনি। বাংলাদেশের নেতিবাচক রাজনীতির ধারায় যা কিনা বিরল! সেই অর্থে মির্জা ফখরুল ইতিবাচক রাজনীতির এক অনন্য উদাহরণ।
১৯৬৩ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার পর মির্জা ফখরুল বাম রাজনীতিতে নাম লেখান। ছাত্র জীবনে তিনি যুক্ত ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মেননপন্থি গ্রুপে। মান্নান ভূঁইয়া যখন ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, তখন তার বেশ ঘনিষ্ঠ  ছিলেন ফখরুল। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল যার কেন্দ্রে। ফখরুল তখন সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন তিনি।
একাত্তরের যুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। উত্তরাঞ্চলে সংগঠক হিসেবে ভূমিকা রাখেন। মির্জা ফখরুলের চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জাও ছিলেন যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। মুজিবনগর সরকার কর্তৃক ডাইরেক্টরেট অফ ইয়ুথ ক্যাম্পের পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।
ফখরুলের পুরো পরিবারই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বাবা মির্জা রুহুল আমিন পেশায় ছিলেন আইনজীবী। ঠাকুরগাঁওয়ে স্বাধীনতার আগে ও পরে একাধিক বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে মির্জা রুহুল আমিন বিএনপি ও জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার অপর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজও একজন সাবেক বিএনপি নেতা। যিনি ১৯৭৮-৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে ভূমিমন্ত্রী, ১৯৭৯-৮২ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে স্পিকার এবং ১৯৯১-৯৬ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক আবহে থাকলেও মির্জা ফখরুল ১৯৭০ সালেই পাবলিক সার্ভিস কমিশনে শিক্ষকতার জন্য পরীক্ষা দেন। স্বাধীনতার পরে তাতে তিনি নিয়োগও পান। তার ভাষায়, ‘পরিস্থিতি দেখে মনে হয়েছিল দেশে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষকতাকে আমি ভালো পেশা মনে করি।’ ফলত ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী এস.এ. বারির ব্যক্তিগত সচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এস.এ. বারি উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিলে ফখরুল আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন তিনি। এরশাদের আমলে সরকারের পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে একজন অডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৮৮ সালে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
১৯৮৯ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। সে বছরই আনুষ্ঠানিক বিএনপিতে যোগদান করেন। দল থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রথম মনোনয়ন পান ১৯৯১ সালে। কিন্তু সেবার তিনি জয়ী হতে পারেননি। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও বিএনপির সভাপতি মনোনীত হন। এরপর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও পরাজিত হন তিনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে ওই আসন থেকে মির্জা ফখরুল প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০০১ সালে খালেদা জিয়ার গঠিত সরকারে মির্জা ফখরুল কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। পরে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনা হলে তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বল্প ব্যবধানে পরাজিত হন তিনি। এই পরাজিত নেতাই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, পর্যায়ক্রমে এসেছেন দলের মহাসচিবের দায়িত্বে। এখন দলের কাণ্ডারি তিনি, তার চোখ দিয়েই বিএনপি দুঃখদিন সামলে উঠার সম্ভাবনা দেখছে!

৩.
মির্জা ফখরুল এখন বিএনপির কাণ্ডারি হলেও দলে কিছুকাল আগেও তার অবস্থান তেমন মজবুত ছিল না। পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক হিসেবে বরাবরই তিনি সামনের সারিতে ছিলেন। কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বী, সমালোচক ও বিরোধীর সংখ্যা কম ছিল না। ২০০৯ সালে মির্জা ফখরুল বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন। এরপর ২০১১ সালের মার্চে বিএনপির মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করলে তিনি ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ হন।
ফখরুল যখন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হয়েছিলেন তখন তার পদায়ন নিয়ে কোনো কোনো সিনিয়র নেতার আপত্তি ছিল। দলের গঠনতন্ত্রে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের কোনো পদ না থাকার যুক্তি এনে তারা ফখরুলের বিরোধিতায় নামেন। কিন্তু দলীয় চেয়ারপারসন তার গঠনতান্ত্রিক ক্ষমতাবলে তাকে ওই পদে নিযুক্ত করার ঘোষণা দিলে এই বিরোধিতা বাহ্যিকভাবে কমে আসে। কিন্তু তা শেষ হয়ে যায়নি। এর মধ্যেই টানা পাঁচ বছর ‘ভারপ্রাপ্ত’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যান তিনি। ২০১৬ সালে যখন তিনি দলের মহাসচিবের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পান, অনেক গণমাধ্যমেই তার ‘ভারমুক্ত’ হওয়ার বিষয়টি শিরোনাম হয়।
বিএনপির প্রথম মহাসচিব ছিলেন একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠাকালীন তাকে মহাসচিবের দায়িত্ব দেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। এরপর ১৯৮৬ সালের ১৭ জানুয়ারি মহাসচিব হন কর্নেল (অব.) মুস্তাফিজুর রহমান। ১৯৮৭ সালের ১৭ মার্চ মহাসচিব পদে আসেন কেএম ওবায়দুর রহমান। পরের বছর ২২ আগস্ট ১৯৮৮ তে মহাসচিব করা হয় ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারকে। ১৯৯৬ সালের জুনে সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির পরাজয়ের পর সালাম তালুকদার পদত্যাগ করলে মহাসচিব পদে আসেন আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। জরুরি অবস্থার সময় খালেদা জিয়া তাকে বহিষ্কার করে মহাসচিব করা হয় খন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হলেন দলটির সপ্তম মহাসচিব।
গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও দলে দীর্ঘদিন কোণঠাসা ছিলেন ফখরুল। দলের দ্বিতীয় প্রধান নেতা তারেক রহমান যে ফখরুলের ওপর ততটা প্রসন্ন নন, এটা সবার জানা। এক সময় তারেক রহমান দলীয় কর্মকাণ্ডে শমসের মবিন চৌধুরীকে বিশেষ গুরুত্ব দেন মির্জা ফখরুলকে এড়িয়েই। কিন্তু দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো দ্বন্দ্বে জড়াননি ফখরুল। এখন শমসের মবিন আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী বিকল্প ধারার নেতা।
এক সময় বিএনপির মধ্যে ফখরুলের বিষয়ে ব্যাপক অনাস্থা ছিল। দলের নেতারা গ্রেপ্তার এড়াতে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। তারা কর্মসূচির আগেভাগে হাসপাতালে আশ্রয় নেন। এমনসব অভিযোগ যখন নেতাদের কারও কারও বিরুদ্ধে উঠেছিল, ফখরুলও তখন এর বাইরে ছিলেন না। তিনি মান্নান ভূঁইয়ার কাছের লোক ছিলেন, এটাও ধর্তব্যে ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের দমনমূলক নানা পদক্ষেপের বরাতেই তিনি সেসব শঙ্কা ভুল প্রমাণ করতে সক্ষম হন।
আওয়ামী লীগ সরকারের এই দুই মেয়াদে তার নামে মোট ৯০টি মামলা দেয়া হয়েছে। এখন সচল আছে ৪৬টি মামলা। এই সময়ের মধ্যেই তিনি ৬ বার কারাগারে প্রবেশ করেন। দেশের ইতিহাসে কোনো শীর্ষ রাজনৈতিক সংগঠনের মহাসচিব পর্যায়ের কাউকে এর আগে এত মামলার শিকার হতে হয়নি। সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি ভাঙচুর, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে গাড়ি ভাঙচুর, সচিবালয়ে ককটেল বিস্ফোরণ, গাড়িতে অগ্নিসংযোগের মতো এমনসব মামলা ফখরুলের বিরুদ্ধে রয়েছে, যা রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক বলেই অভিযোগ করা হয়। এর মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলেছেন মির্জা ফখরুল।
এখন ফখরুলের নেতৃত্বে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছে। ৩০০ আসনে দলের নেতাদের মনোনয়নের চিঠি যাচ্ছে তারই হাত দিয়ে। তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের অনুসারী হয়েই তিনি নিজের স্বকীয় অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। বিএনপি এ মুহূর্তে আদালতের সঙ্গে বড় দ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছে। নেতারা প্রায়শই অভিযোগ করছেন, সরকার তাদের বিরুদ্ধে আদালতকে ব্যবহার করছে। এরকম অবস্থায় মির্জা ফখরুল তার মার্জিত ভাষা দিয়ে বিএনপির অবস্থান ব্যাখ্যা করে চলেছেন। আদালত অবমাননা বা সেরকম কোনো অভিযোগ এখনও তার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো যায়নি।
এটা পরিষ্কার যে, বেশ সতর্কতার সঙ্গে তিনি পদক্ষেপ ফেলছেন। আজকের দুঃসময়ে বিএনপির এমন একজন নেতারই দরকার ছিল। যিনি ঠান্ডা মাথায় কাজ করবেন, অযথা বিতর্কে জড়াবেন না। যার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও সব মহলের সঙ্গে আলোচনায় বসার মতো গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এরকম নেতা বিএনপিতে তো বটেই মূলধারার অন্য দলেও খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।

৪.
মির্জা ফখরুলের তেমন কোনো সফলতা অবশ্য এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। একমাত্র সফলতা হলো, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখনও দলের সিনিয়র নেতারা কেউ তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেননি। যেটা মোটেই অসম্ভব ছিল না। শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতেই এমন ঘটনা হরহামেশা ঘটে থাকে। ফখরুলের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুললে দলটি আরও খারাপ অবস্থায় পড়ে যেত। দলের কর্মীরা নেতাদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলতেন, মনোবল চলে যেত তলানীতে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেরকম কিছু যে ঘটেনি, এটাই ফখরুলের বড় কৃতিত্ব।
মির্জা ফখরুল দলের দায়িত্ব নেয়ার পর পিলখানা  হত্যাকাণ্ড,  শেয়ারবাজার-ডেসটিনি কেলেঙ্কারি, সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, তিস্তার পানিবণ্টনে বৈষম্যসহ সরকারের আমলে সংঘটিত নানা দুর্নীতি ও ইলিয়াস আলীসহ বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের গুম-খুনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে বিএনপি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির যে আন্দোলন তারও মূল নেতা ফখরুল। কিন্তু আওয়ামী লীগকে মাঝেমধ্যে চাপে ফেলতে পারার চেয়ে এসব আন্দোলনের আর কোনো বড় সাফল্য নেই। কোনো একটি ইস্যুতেও সফল ও কার্যকর আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারেননি ফখরুল। এর পেছনে নিশ্চয়ই অনেক কারণ রয়েছে, কিন্তু সাংগঠনিক পর্যায়ের মূল নেতা হিসেবে ব্যর্থতার দায় তার কাঁধেই বর্তায়।
বড় সফলতা না থাকলেও ফখরুলের জন্য অপেক্ষা করছে অপার সম্ভাবনা। দলকে বিজয়ী করে আনতে পারলে সামনে তার অনেক পথ। কিন্তু নির্বাচনে পরাজিত হলে আশঙ্কা রয়েছে দায়িত্ব থেকে তার সরে যাওয়ার। সেটা হলে ফখরুলের রাজনৈতিক পরিণতি কী হবে, তা অনুমান করা কঠিন। তবে নির্বাচনে জয়ী হলে কি তার হাত ধরে কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে?
বিএনপির রাজনীতির গোড়া থেকেই জামায়াতের সঙ্গে সখ্যতার সম্পর্ক ছিল। কিন্তু দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অনেকে জামায়াতবিরোধী ছিলেন। দলটিতে মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছেন অনেক। ফলে সব সময় দলের নেতৃত্বকে প্রভাবিত করতে জামায়াতপন্থি একটি সিন্ডিকেট বিএনপিতে সক্রিয় থাকে। এই সিন্ডিকেটের বড় শত্রু ছিল মান্নান ভূঁইয়া। স্বাভাবিকভাবেই মির্জা ফখরুলও তাদের লক্ষ্যবস্তু।
বিএনপি জামায়াতকে ত্যাগ করেনি। নির্বাচনে তারা বিজয়ী হলে ধারণা করা যায় জামায়াতের পুনরুজ্জীবন ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে কোনো একপর্যায়ে মির্জা ফখরুল যে তাদের দ্বারা ধরাশায়ী হবেন না, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ শীর্ষ নেতা তারেক রহমান জামায়াতপন্থিদের দ্বারা আগে থেকেই প্রভাবিত এবং মির্জা ফখরুলের ব্যাপারে তার বিরাগের কথাও কারও অজানা নয়।
আরও বড় ব্যাপার হলো, জামায়াতের পুনরুজ্জীবন ঘটলে পুরো দেশকেই তার দায় মেটাতে হবে। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার প্রতিক্রিয়াশীল ছায়া আরও দীর্ঘ হবে। দেশ এদিকে ধাবিত হলে বাধাগ্রস্ত হবে জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ। একটি উদার, গ্রহণযোগ্য, গণতান্ত্রিক সমাজের যে চাওয়া শিক্ষিতশ্রেণি পোষণ করে, তা থেকে যাবে একেবারেই অধরা।
বিএনপি ক্ষমতায় এলে অনৈক্য, বিভেদের রাজনীতিও চাঙ্গা হতে পারে। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এই আমলে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। খালেদা জিয়ার পুত্র আরাফাত রহমানের মৃত্যুর পেছনেও পরোক্ষভাবে সরকারের কঠোর মনোভাবকেই দায়ী করেন বিএনপি নেতারা। খালেদা জিয়াকে স্বামীর স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, তাকে অসুস্থতার মধ্যেও কারাগারে প্রেরণ, এসব ক্ষত বিএনপির নেতাকর্মীরা বয়ে বেড়াচ্ছে। ক্ষমতায় এসে তারা পাল্টা প্রতিহিংসার পথ বেছে নিলে দেশে হানাহানি চরম রূপ নেবে। রাজনীতিতে অনৈক্য, বিভেদ আগের সব সীমা ছাড়িয়ে ভয়ঙ্কর চেহারা ধারণ করবে।
অথচ ফখরুলের সামনে সুযোগ ছিল। দলের নেতারা যেকোনো মূল্যে তাকে ঐক্য করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জামায়াতবিরোধী ধারাকে এই সুযোগে শক্তিশালী করতে পারতেন। ড. কামাল হোসেনরা যেসব আশা নিয়ে বিএনপির সঙ্গে জোট বাঁধতে এসেছিলেন, সেগুলোকে পুঁজি করে দলের অভ্যন্তরে কিছু সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তিনি শীর্ষ নেতাদের বুঝাতে পারতেন। যে সুস্থ পরিচ্ছন্ন ধারার রাজনীতির প্রতিনিধি তিনি, তেমন ধারার নেতাকর্মীদের অগ্রাধিকার দেয়ার প্রয়োজনীয়তা দলে প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন।
কিন্তু ফখরুল পরিবর্তন ঘটানোর কোনো চ্যালেঞ্জ নেননি। দলে পুরনো যেসব নেতিবাচক ধারা আছে, সেগুলোকে দূর করার জন্য তেমন কোনো শক্তি প্রয়োগ করেছেন বলে জানা যায় না। দলের ভেতরে ও বাইরে দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ চালানোর সাহস তিনি দেখাতে পারেননি বরং ঐক্য ধরে রাখতে অনেক ক্ষেত্রে নীরবতার কৌশলকেই সমাধান মেনেছেন। এটাকে অনেকে তার চরিত্রের আপসকামিতা হিসেবে সমালোচনা করেন।
এটা পরিষ্কার যে, মির্জা ফখরুলের সফলতা ও ব্যর্থতাÑ উভয়ের ওপরেই আশঙ্কার কালো মেঘ ছায়া ফেলছে। দলে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনতে না পারাটাই এর কারণ। তবে সব সমালোচনা সত্ত্বেও এটা যে কেউ মানবেন যে, মির্জা ফখরুল বিএনপির ইতিহাসের অন্যতম একজন যোগ্য নেতা। সবচেয়ে দুঃসময়ে তিনি দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এগিয়ে চলেছেন। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি নিয়ে তিনি যে এতদূর আসতে পেরেছেন, এদেশের মানদণ্ডে এটাই বিরাট এক সফলতা। শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুলের নেতৃত্ব বিএনপিকে উদ্ধার করতে পারবে কিনা, সেটা দেখার জন্য আর অল্প কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.