একাদশ সংসদ নির্বাচন : তরুণরা কাকে চাইবেন -শুভ কিবরিয়া

Print Friendly and PDF

দেখতে দেখতে একাদশ সংসদ নির্বাচনের দিন এগিয়ে আসছে। প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনের আশা যেমন বাড়ছে, সুষ্ঠুভাবে ভোট হবে কিনা তা নিয়েও বাড়ছে সংশয়-সন্দেহ। রাজনীতির মাঠে নানারকম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়েই কথাচালাচালি চলছে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল ও জোটের মধ্যে। এটা একটা দিক। অন্যদিকে এবার ভোটারদের একটা বড় অংশ তরুণ ভোটার। সেই ভোটারদের মন জয় করার বিষয়টিও এবারের নির্বাচনে যারা মাঠে আছেন তাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। এবারের নির্বাচনের নানা দোলাচলের মধ্যেও তরুণ ভোটারদের এই আধিক্য নির্বাচনকে কীভাবে প্রভাবিত করবে তা বিশ্লেষণ করেছেন শুভ কিবরিয়া

ভোটের বাড়ি জোটের গাড়ি
একদশক পরে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের যে সুযোগ এসেছে তাতে ৩০০ আসনে তিন হাজারের ওপর মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষে বোঝা যাবে কারা কোন দলের প্রতীকে নির্বাচন করছেন। বিপুলসংখ্যক মনোনয়নপত্র পড়ার একটা কারণ বিএনপি প্রতিটি আসনে একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়। কেননা বিএনপি নিশ্চিত নয় কোন প্রার্থীর মনোনয়ন টিকবে আর কারটা বাদ যাবে। ইতোমধ্যে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বিএনপির বহু হেভিওয়েট প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল ঘোষিত হয়েছে। অন্যদিকে মহাজোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে প্রার্থিতা চূড়ান্ত করে ঘোষণা না দেয়ায় উভয়পক্ষেই জোটভুক্ত দলের প্রার্থীরা নিজ নিজ দলের পক্ষে মনোনয়ন জমা দেন। কাজেই ৯ ডিসেম্বরের পর চূড়ান্তভাবে জানা যাবে কোন আসনে কে কী প্রতীকে নির্বাচন করছেন।
প্রধান দুই জোটের প্রার্থী শেষ পর্যন্ত কারা থাকছেন সেটা নিশ্চিত হতেও আগামী ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যদিও এক্ষেত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অনেকটাই এগিয়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শক্ত হাতে সংসদীয় আসনের প্রার্থিতা নির্ধারণে ভূমিকা রাখছেন। ক্ষোভ, বিদ্বেষ, বিদ্রোহ থাকলেও শেষাবধি প্রকাশ্যে তার উপস্থিতি খুব একটা দেখা যাবে বলে মনে হয় না। যা কিছু ঘটবে গোপনে এবং তৃণমূলে। জোটের শরিকদের আসন বণ্টনকেও একটা স্বস্তিকর জায়গায় শেষাবধি আনতে পেরেছে আওয়ামী লীগ। মহাজোটের শরিকদের মধ্যে একমাত্র জাতীয় পার্টি ছাড়া বাকি যারা আছেন, তাদের পক্ষে খুব একটা দেনদরবার করার শক্তি নেই। তাদের লক্ষ্য শেখ হাসিনার সহানুভূতি ও আনুকূল্য। সেই বিবেচনায় জাতীয় পার্টিকেও লাঙ্গল প্রতীকে অনধিক ৫০ আসনেই সীমিত থাকতে হবে। অন্যদিকে বিএনপির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, বিএনপি দলীয়ভাবে যাদের মূল প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিতে চেয়েছে, বাছাই পর্বে শেষ পর্যন্ত তারা টিকে কিনা। কিংবা বাছাই পর্বে টিকলেও জেলখানার বাইরে থাকে কিনা। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে অপরাপর যেসব প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছেন, তারা কতটা স্বেচ্ছায় মূল প্রার্থীর জন্য নিজেদের আত্মত্যাগ করতে পারে। প্রতিটি আসনে একাধিক প্রার্থীকে নমিনেশন দেয়ার এই বিবেচনা মাঠপর্যায়ে বুমেরাং হয় কিনা সেটাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ বিএনপির জন্য।
তৃতীয়ত, বিএনপির ২০ দলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট দুই জোটকে মাথায় রেখে আসন ছাড়তে হচ্ছে। এই আসন ছাড়াছাড়ি, ভাগাভাগি কতটা যৌক্তিক, কতটা বাস্তবসম্মত এবং দল ও জোটকে তা কতটা সন্তুষ্ট রাখে, সেটা বড় চ্যালেঞ্জ। ইতোমধ্যে ২০ দলীয় জোট সঙ্গী জামায়াতকে ২৫টি আসন ছাড়তে চেয়েছে বিএনপি। সেটাও মাঠপর্যায়ে বিএনপির ভোটারদের কতটা সন্তুষ্ট রাখে, সেই চ্যালেঞ্জ মাথায় রাখতে হবে বিএনপিকে।

বৈশিষ্ট্যময় ভোট
এবারের নির্বাচনে কতগুলো মৌলিক বৈশিষ্ট্য আছে।
মহাজোটের শরিক হিসেবে থাকছে এরশাদের জাতীয় পার্টি, বি চৌধুরীর যুক্তফ্রন্ট, ১৮ দলীয় জোটের শরিকসহ অন্যান্য কিছু ইসলামি দল। মহাজোট সরকার ক্ষমতায়। তাই মহাজোটের প্রার্থীদের পক্ষে পরিস্থিতি তুলনামূলক অনুকূল। মহাজোটের শরিক বড় দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শেষাবধি শরিকদের জন্য ৬০-৭০ আসন ছাড়তে পারে বলেই মনে হচ্ছে। জাতীয় পার্টি ছাড়া মহাজোটের শরিকরা আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কা প্রতীকেই নির্বাচন করবেন।
অন্যদিকে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপির ওপর ভর করে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সব শরিকরাসহ ২০ দলীয় জোটের অধিকাংশ দলের প্রার্থীরাই বিএনপির প্রতীক ধানের শীষেই নির্বাচন করছেন। একটা প্রতিকূল পরিবেশে বিএনপির প্রার্থীদের নির্বাচন করতে হচ্ছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকারের অধীনেই শেষাবধি তাদের নির্বাচনে আসতে হয়েছে। যে কোনো মূল্যেই তারা নির্বাচনের মাঠে থাকতে চাইছেন।
বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়েই ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামের প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। প্রায় ২৫ আসনে জামায়াত তাদের প্রার্থিতা নিশ্চিত করেছে। নিজেদের দলের নিবন্ধন না থাকায় ধানের শীষ প্রতীকেই ভরসা করেছে জামায়াতে ইসলামী। যদিও প্রার্থিতা যাচাই-বাছাই শেষে জামায়াতের পক্ষে আরও বেশ কিছু আসনে দাবি থাকবে।
এবারের নির্বাচনে বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়াসহ দ-িত অনেক নেতাই নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারছেন না। খালেদা জিয়া, তারেক জিয়াকে ছাড়াই বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
এর বাইরে এবারই বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার ভোট দিতে যাচ্ছে। পার্টিজান ভোটারের বাইরে এই তরুণ ও প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাওয়া ভোটারদের সমর্থনের উপরেই নির্ভর করবে প্রার্থীদের জয়-পরাজয়।  

তারুণ্য এবং ভোটার
যদি সত্যি সত্যি একটা মানসম্পন্ন নির্বাচন এবার হয়, ভোটকেন্দ্রে নির্বিঘেœ যেতে পারে ভোটাররা, নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে স্বাচ্ছন্দ্যে ও নির্ভয়ে, তবে সকল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে জয়ের জন্য নির্ভর করতে হবে তরুণ ভোটারদের ওপর। এখন প্রশ্ন হলো তরুণ ভোটার কারা? ভোটার  তালিকায় তাদের অবস্থানই বা কেমন? পরিসংখ্যান বলছে :
এক. এবার একাদশ সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা হচ্ছে ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০। এর মধ্যে নতুন ভোটার হয়েছেন ১ কোটি ২৩ লাখ (প্রায়)।
দুই. ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে নতুন ভোটার হয়েছিলেন ১ কোটি ৩৭ লাখ (প্রায়)।
দশম সংসদ নির্বাচন যেহেতু প্রতিনিধিত্বমূলক ছিল না এবং ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনাভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন সেহেতু এই ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন নাই বলেই ধরা হয়।
তিন. ২০১৮ সালের নির্বাচনে নতুন ভোটারের সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ (প্রায়)। যারা প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। এই নতুন ভোটার মোট ভোটারের প্রায় ১১.৮০ শতাংশ। এটা খুবই উল্লেখযোগ্য সংখ্যা।
চার. ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যারা নতুন ভোটার হয়েছিলেন তারা সেসময় যেহেতু ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন নাই তাই এবার ভোট দিতে পারলে সেটা হবে তাদের জীবনে প্রথম ভোট দেয়ার সুযোগ। সেই হিসেবে ২ কোটি ৫০ লাখ (প্রায়) ভোটার এবার জীবনে প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন। এই সংখ্যা মোট ভোটারের প্রায় ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ এবার প্রায় প্রতি চারজনে একজন ভোটার প্রথমবারের মতো ভোট দেয়ার সুযোগ পাবেন। এই সংখ্যা খুবই উল্লেখযোগ্য।
পাঁচ. পরিসংখ্যান বলছে ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা মোট ভোটারের প্রায় ২২ শতাংশ। অর্থাৎ মোট ভোটারের ২২ থেকে ২৪ শতাংশ নতুন ও তরুণ ভোটারদের মোকাবিলা করতে হবে এবারের সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের।
ছয়. পরিসংখ্যান বলছে প্রতি বছর গড়ে ২২ থেকে ২৪ লাখ নতুন ভোটার তালিকায় যুক্ত হন। আবার মৃত্যুর কারণে প্রতি সংসদ নির্বাচনে কিছু পুরাতন ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েন বা তারা ভোট দিতে পারেন না।
সাত.  ২০০৮ সালে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ০৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার ০৩। ২০১৮ সালে তা দাঁড়ায় ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জনে। এক দশকে ভোটার বেড়েছে ২ কোটি ৩১ লাখ ০৩ হাজার ৪৭৭ জন।

কর্মসংস্থান ও তারুণ্য

তরুণদের মুখ্য চাওয়া পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ নিশ্চিত হওয়া। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে ঢুকছে। অথচ কর্মসংস্থান হচ্ছে ১৩ লাখ। বেকার থাকছে তরুণদের একটা বড় অংশ। আবার শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে। আমাদের তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক প্রতিবেদনে পাওয়া যাচ্ছে এ বিষয়ের হালনাগাদ চিত্র।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলের ২৮টি দেশের বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থান, নিষ্ক্রিয় তরুণের হার, আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, কর্মসন্তুষ্টি ইত্যাদির তুলনামূলক চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের ওপরে আছে কেবল পাকিস্তান।
বাংলাদেশের তরুণদের বড় অংশ আবার নিষ্ক্রিয়। তাঁরা কোনো ধরনের শিক্ষায় যুক্ত নন, প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন না, আবার কাজও খুঁজছেন না। দেশে এমন তরুণের হার ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। মেয়েদের মধ্যে এই হার বেশি, ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গত এপ্রিলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে বেকার ছিল ২৬ লাখ ৭৭ হাজার; যা আগের বছরের চেয়ে ৮৭ হাজার বেশি। ওই সময় কমপক্ষে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে সাড়ে ৪০ হাজার তরুণ-তরুণী বেকার ছিলেন। এ ছাড়া উচ্চমাধ্যমিক পাস করে বেকার ছিলেন ৬ লাখ ৩৮ হাজার।
আইএলওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে দেড় যুগ আগে ২০০০ সালে সার্বিক বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১০ সালে তা ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৩, ২০১৬ ও ২০১৭ সালের হিসাবে এই হার একই থাকে (৪ দশমিক ৪ শতাংশ)। বাংলাদেশে পুরুষের ক্ষেত্রে বেকারত্ব ৩ দশমিক ৩ শতাংশ ও নারীর ক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।
বাংলাদেশে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন পর্যায়ে বেকারত্বের হার কত, তাও তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। বলা হচ্ছে  ২০১৭ সালে বাংলাদেশে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর পার হয়নি এমন মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম (১ দশমিক ৮ শতাংশ)। প্রাথমিক পর্যায় শেষ করা মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। যাঁরা মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষিত, তাঁদের মধ্যে বেকার সাড়ে ৮ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ।

অভিজ্ঞতা ও তারুণ্য

গত একদশকে বাংলাদেশে তরুণদের নানারকম বিরূপ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। রাষ্ট্র জোর করে উচ্চশিক্ষার ওপর ভ্যাট বসাতে চেয়েছে। তরুণরা উচ্চশিক্ষায় ভ্যাট মানতে চায়নি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসমাজ সরকারের চাপের কাছে মাথা নোয়ায়নি। প্রবল শক্তিমান সরকারের বিরুদ্ধে ভ্যাট বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থী সমাজের রাজপথ দখল করে চলা অহিংস আন্দোলন বহু বছর পর বাংলাদেশের জনসমাজকে হতবিহ্বল করে দেয়। একসময় সরকার উচ্চশিক্ষায় ভ্যাট আদায়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। এই শিক্ষার্থী সমাজই নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় এক অভূতপূর্ব আন্দোলন গড়ে তোলে। সেখান থেকে তারা রাষ্ট্র মেরামতের দাবিও তোলে। তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে,‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। রাষ্ট্র তাও ভালো চোখে দেখেনি। নিপীড়ন আর শক্তির জোরে ছাত্রসমাজকে সেই আন্দোলনে ক্ষান্ত দিতে হয়।
সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ ছাত্রসমাজের দাবিকে গোটা রাষ্ট্র শক্তি দিয়ে রুখতে চেয়েছে। সেই আন্দোলনে ছাত্রসমাজ বহুরকম নিপীড়নকে উপেক্ষা করেই রাজপথে থেকেছে। শেষে কোটা সংস্কারের বদলে রাষ্ট্র তার নিজ শক্তিবলে কিছুটা ক্ষিপ্ততাতেই সরকারি চাকরিতে সকল রকম কোটা বাতিল করে গেজেট জারি করেছে। তরুণ সমাজ চেয়েছে ডিজিটাল জগতে মুক্ত পরিবেশ থাকুক। তার বদলে এসেছে কখনো ৫৭ ধারা কখনো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। সব মিলিয়ে চিন্তার স্বাধীনতা, মতামত ব্যক্ত করার স্বাধীনতা, কর্মের উপযুক্ত ব্যবস্থা ও পরিবেশ সব জায়গাতেই তরুণ সমাজের আশা-আকাক্সক্ষা দু পা এগিয়ে চার পা পিছিয়েছে। তরুণ সমাজ যে অসাম্প্রদায়িক, উৎকৃষ্ট রাজনৈতিক পরিবেশের জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র দেখতে চেয়েছে, অর্থনৈতিক বিচারে দেশের অনেক উন্নতি হলেও, কাক্সিক্ষত সেই রাষ্ট্রনৈতিক পরিবেশ আসে নাই। তরুণদের মধ্যে শক্তি আছে, সকল বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার লড়াকু মন আছে, কিন্তু রাষ্ট্র ও  রাজনীতি তাদের পাশে এসে তাদের মতো করে দাঁড়ায়নি। তাই একদিকে রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক পক্ষগুলোর প্রতি যেমন তাদের ক্ষুব্ধতা আছে, তেমনি আছে তাদের নতুন প্রতিশ্রুতিও। তারা চায় রাজনৈতিক দলগুলো পুরনো চশমা খুলে ফেলে তরুণদের চোখে এই পৃথিবীকে দেখুক। নতুন বাংলাদেশকে দেখুক। এবারের নির্বাচনে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে তারা তাই চায় বাস্তব প্রতিশ্রুতি এবং তার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার। বড় দুই রাজনৈতিক দলের  জন্য এবার সম্ভবত বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো তরুণদের মন জয় করাটা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় বিবেচনা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই, দলমত নির্বিশেষে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথনির্দেশ, টেকসই ও বৈষম্য কমিয়ে আনার উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা, হিংসামুক্ত স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বিনির্মাণÑ এসব বিষয়কে বিবেচনায় নিয়েই হয়তো তরুণ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাবে তাদের স্বাধীন মতামত প্রকাশ করতে।

রাজনীতির চ্যালেঞ্জ
এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ ভোটারদের মন জয় করতে রাজনীতিবিদরা কী প্রতিশ্রুতি সামনে নিয়ে আসছে সেটা একটা বড় বিষয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের দুটো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তরুণদের মনে দাগ কেটেছিল। এক. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, দুই. ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি। সেই দুই প্রতিশ্রুতির উপর তরুণ ভোটাররা সেবার আস্থা রেখেছিল। এর মধ্যে গত একদশকে আওয়ামী লীগের শাসনামল তারা দেখেছে। দেখেছে বিস্তর অবকাঠামোগত উন্নয়ন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কম গণতন্ত্রে অধিক উন্নয়নের শাসনামলের অভিজ্ঞতা নিয়েই এবার তারা ভোটকেন্দ্রে যাবে। অন্যদিকে গত একদশকে ক্ষমতার বাইরে আদালত পাড়ায় দৌড়াতে থাকা বিএনপির নেতাদের বক্তব্য ও কর্মকা- দেখছে নতুন ভোটাররা। তারা কি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রাখে তরুণদের জন্য সেটাও পরখ করার সুযোগ আসছে। শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিই নয়, তা পালনে রাজনৈতিক দলগুলোর সক্ষমতা কতটুকু সেটাও দেখবে তরুণ ভোটাররা।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.