নির্বাচন হবে, সুষ্ঠু হবে? -গোলাম মোর্তোজা

Print Friendly and PDF

কোনো একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যখন জাতীয় নির্বাচন হয়, বাংলাদেশে সেই নির্বাচন কখনো সুষ্ঠু হয় না। অতীতে কখনো হয়নি। ১৯৯১ সালের আগে পর্যন্ত সামরিক সরকারগুলোর সময়ে যেসব নির্বাচন হয়েছে, তার কোনোটাই সুষ্ঠু হয়নি। সত্যি কথা বলতে, সেগুলো কোনো নির্বাচনই ছিল না। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে নিশ্চিত করেই বলা যায় আওয়ামী লীগ বিজয়ী হতো। জনগণের ভোটে পরাজিত খন্দকার মোশতাকের মতো দু’এক জনকে জেতানোর জন্যে, সেই নির্বাচনটিও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিল।
বাংলাদেশে জনগণের ভোটের প্রতিফলন দেখা যাওয়া শুরু হয় ১৯৯১ সাল থেকে। যখন নির্বাচন হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। এখন আবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনটি কেমন হবে, কেমন হলো তা সরকারি দল একভাবে দেখবে। বিরোধী দল দেখবে তার দৃষ্টিকোণ থেকে। তৃতীয় একটি অবস্থান থেকে দেখবে পর্যবেক্ষকরা। এর মধ্যে দেশি পর্যবেক্ষক আছেন, আছেন বিদেশি পর্যবেক্ষক। বাংলাদেশের মতো দেশের জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক  কতটা গুরুত্বপূর্ণ, বিদেশি পর্যবেক্ষক অপরিহার্য কিনা?

১. বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন এমন বেশকিছু প্রতিষ্ঠান আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশটা এনজিও হিসেবে অন্যান্য কাজও করে। বাংলাদেশের রাজনীতি যেমন আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুইভাগে বিভক্ত, বিভক্ত পর্যবেক্ষকরাও। তাছাড়া এনজিও হিসেবে কাজ করায়, সরকার অসন্তুষ্ট হতে পারে এমন ঝুঁকি নিতে পারে না। নির্বাচন কমিশন সচিব ইতোমধ্যে তাদের হুমকি দিয়ে রেখেছেন ‘নিবন্ধন বাতিল’ হয়ে যেতে পারে। পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রধান ব্যক্তিরা যেহেতু দলীয়ভাবে কথা বলেন, অনেকে সরকারের আনুকূল্য নিয়ে থাকেন, ফলে তারা যা বলেন বা তাদের প্রতিষ্ঠানের যে পর্যবেক্ষণ তা খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা পায় না।

২. দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, দেশি পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে আস্থাহীনতা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতি অবিশ্বাসে, জনমন থেকে এই বিশ্বাস প্রায় উঠে গেছে যে নির্বাচন ‘সুষ্ঠু’ হবে। এখানেই আসছে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের প্রসঙ্গ।
বাংলাদেশের সাধারণ জনমানুষের ভেতরে বিশেষ করে যারা, একটু সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করেন, তারা নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষক দেখতে চান।
জনমনে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত যে, সরকার ধমক দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করতে পারবেন না। তারা যা দেখবেন, তাই বলবেন। তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসবে সঠিক চিত্র।

৩. যখন জানা গেল ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবারের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে না, তখন যেন কিছুটা হতাশা তৈরি হলো। মানুষ মনে করে দেশি পর্যবেক্ষকরা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন, গণমাধ্যমের সংবাদকে সরকার এখন খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। যদিও শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের গণমাধ্যম নির্বাচনের অনিয়ম-বিচ্যুতিগুলো মোটামুটি সঠিকভাবে পরিবেশন করে। গণমাধ্যমে প্রদর্শন করা সংবাদ মোকাবিলায় সরকার একটা অদ্ভুত নীতি অনুসরণ শুরু করেছে। ধরুন, কোনো একটি আসনে মোট ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৪০০। গণমাধ্যমে দেখানো হলো কেন্দ্র দখল-ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জালভোট, মাস্তানির চিত্র। ৪০০ কেন্দ্রের মধ্যে গণমাধ্যম হয়তো দেখালো ২০টি কেন্দ্রের চিত্র। তখন সরকার বলতে শুরু করে ৪০০ কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ২০টিতে অনিয়ম হয়েছে, বাকি ৩৮০টি কেন্দ্রে নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও সরকারের এই যুক্তিটিই গ্রহণ করে। সরকার এবং নির্বাচন কমিশন বলতে শুরু করে মাত্র ৫ শতাংশ কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে। বাকি ৯৫ শতাংশ কেন্দ্রে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। এই ৯৫ শতাংশ কেন্দ্র যে অনিয়ম হওয়া ২০ শতাংশের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়, তা গণমাধ্যমে তেমন একটা প্রকাশিত হয় না। গোলযোগ হয় এমন কেন্দ্রের সংবাদই গণমাধ্যম জোর দিয়ে প্রচার করে। গোলযোগ ছাড়া যে কারচুপি হয়, তার সঠিক চিত্র উঠে আসে না গণমাধ্যমে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর থাকায়, পর্যবেক্ষকদের ভেতরে একটা ভয় কাজ করতে পারে। তাছাড়া নির্বাচন কমিশন বলে দিয়েছে ‘মূর্তির মতো’ দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ছবি তোলা যাবে না, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথাও বলা যাবে না।

৪. সঠিক চিত্র অর্থাৎ ২০টি কেন্দ্রের বাইরের ৩৮০টি কেন্দ্রেরও অধিকাংশ কেন্দ্রে যে অনিয়ম হয়েছে, তা বলে শুধু বিরোধী দল। স্বাভাবিকভাবেই সে কথা সরকারের কাছে বা নির্বাচন কমিশনের কাছে গুরুত্ব পায় না।
বাস্তবতা হলো, ৪০০ কেন্দ্রের প্রায় সব কটিতে অনিয়ম হয়। বিরোধী দলের এজেন্টদের সরকারি বাহিনী বের করে দেয়। নির্বাচনের আগের কয়েক দিন ধরপাকড় করে, আগের রাতে এজেন্টদের বাড়িতে গিয়ে হুমকি দেয়। নির্বাচনী কর্মকর্তারা সরকারের মনোভাব বুঝে কাজ করেন। এসব কথা গণমাধ্যম ছাড়া বলার বা দেখার আর কেউ থাকে না। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি থাকলে তারা হয়তো বলতেন। জনমানুষের ধারণা এমনই।

৫. বিদেশি পর্যবেক্ষক বিশেষ করে ইইউ কেন পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছেন না, তা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা আছে। বাংলাদেশের সচেতন শ্রেণির ভেতরে ক্রমেই এই বিশ্বাসও তৈরি হচ্ছে যে, বাংলাদেশের সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া বা না হওয়া নিয়ে পৃথিবীর কোনো দেশই চিন্তিত নয়। পর্যবেক্ষক পাঠালে সত্যটা বেরিয়ে আসতে পারে। তা হয়তো গুরুত্বপূর্ণ দেশের সরকারগুলোও চান না। কিছু কথা বলতে হয় বলে বলেন। তারাও বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রেখে নিজের দেশের জন্যে কিছু পেতে চান। প্রশ্ন আসতে পারে, ধনী একটি দেশ বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশের থেকে কী চাইবে বা কী পাওয়ার আছে? সরলভাবে এমন প্রশ্ন সামনে আনলেও, উত্তর এত সরল নয়। উত্তর আমেরিকার যে দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ  উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে, সরকারের বা নির্বাচনের দোষত্রুটি এখন তাদের কাছে আর অতটা বিবেচনার বিষয় নয়। আরেকটি দেশ খনিজসম্পদ সেক্টরে বা এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের ব্যবসা করার সুযোগ পেয়ে খুশি। কেউ ই-পাসপোর্ট, কেউ স্যাটেলাইট, কেউ ট্রানজিট বা করিডোর, কেউ সেতুর কাজ, কেউ বিদ্যুৎ সেক্টরে ব্যবসার সুযোগ পেয়ে খুশি।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সুষ্ঠু নির্বাচন বিদেশি কোনো দেশের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইস্যু নয়। সুতরাং কারণ যাই বলা হোক, বিদেশি পর্যবেক্ষক না পাঠানোর মূল কারণ তা নয়। বাংলাদেশের নির্বাচনের সঠিক চিত্র জানার জন্যে বিদেশি পর্যবেক্ষকের প্রয়োজন আছে। বিদেশি পর্যবেক্ষক বিশেষ করে ইইউ পর্যবেক্ষক না আসায় জনমনে কিছুটা হলেও হতাশাও আছে।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

এই সময়/রাজনীতি
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.