[মতামত] রোহিঙ্গাদের অনিশ্চিত ফিরে যাওয়া

Print Friendly and PDF

করীম রেজা

বহুল আলোচিত ও প্রতীক্ষিত বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার আগেই হোচট খেল।  অসমন্বয় দিয়ে, আন্তর্জাতিক সমাজ তথা জাতিসংঘের সঙ্গে বোঝাপড়া ছাড়াই মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু সফল হলো না। কারণ হিসেবে রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে অনীহার বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।
কবে নাগাদ ফিরতি প্রক্রিয়া শুরু হবে তাও ঠিক নেই। কমিশনার আবুল কালাম আসন্ন নির্বাচনের দোহাই দিলেও বিদেশ মন্ত্রণালয় তা অস্বীকার করেছে। সচিব পর্যায়ের কারও প্রতিক্রিয়া এখনও জানা যায়নি।
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ ব্যর্থ হলেও, মিয়ানমার সার্থক। মিয়ানমার বিভিন্ন রাষ্ট্রের, সংস্থার চাপে যে কোনোভাবে মুখ রক্ষার উপায় খুঁজছিল রোহিঙ্গা ফেরতের কার্যক্রম চালু করে। আন্তর্জাতিক চাপ কিছুটা হলেও কমবে এই আশায়। উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ায় মিয়ানমারের পুরনো অভিযোগ আরও জোরালো হলো যে, বাংলাদেশই প্রত্যাবাসন আরম্ভ করতে পারেনি।
 রোহিঙ্গাদের ফেরত দিতে পারছে না বলে সবসময় অভিযোগের আঙুল বাংলাদেশের দিকে তুলেছে মিয়ানমার। নিজেরা নির্দোষ থেকেছে। রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে স¤পূর্ণরূপে প্রস্তুত এই কথা বলে আন্তর্জাতিক সমাজের মনোযোগ কাড়তে চেষ্টা করেছে। বরাবর মিয়ানমার রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়ে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
এমনকি আন্তর্জাতিক আদালত, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির অভিযোগ, জাতিসংঘের অভিযোগ, মানবাধিকার কমিশন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, তুরস্ক এবং বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে, অস্বীকার করেছে। দায় চাপিয়েছে ‘আরসা’ নামে কল্পিত, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তৈরি করা একটি সংগঠনের ওপর। তথাকথিত সীমান্ত চৌকিতে আক্রমণের খোঁড়া অজুহাতে মিয়ানমার নির্মম অমানবিকতা আড়াল করতে চেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ মিয়ানমারের প্রত্যাবর্তন নামক ফাঁদে পা দিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যা আরও প্রলম্বিত করল।
এ ধরনের প্রমাদমূলক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগেও নেয়া হয়েছে। এর পেছনে কাদের উর্বর মাথা জড়িত জানা যায়নি। চীন, ভারত, রাশিয়া এবং জাপানের প্রচ্ছন্ন, প্রকাশ্য চাপের মুখে বাংলাদেশ মিয়ানমারের দেয়া শর্তসমূহ মেনে আসছে। অবর্ণনীয়, অমানবিক, আতঙ্কজনক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে প্রাণ রক্ষা করেছে। স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা না পেলে, যাবে না। তাছাড়া রয়েছে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রচার-প্ররোচনা। বলা যায় মিয়ানমারে জাতিসংঘ প্রতিনিধির সার্বক্ষণিক উপস্থিতি ও তদারকি ছাড়া রোহিঙ্গাদের জীবনযাপন ও বসবাস কোনোভাবেই নিরাপদ ও সংকটমুক্ত নয়।
 রোহিঙ্গা সংকটের উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে সুবিধা নেয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়েছে মিয়ানমারকে বারংবার বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। রোহিঙ্গাদের নাম নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের ইউ এন এইচ সি আরকে সংযুক্ত না করে কাজ শুরু করা হয়। দ্বিতীয় দফায় তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে তা করেও মিয়ানমারের আপত্তিতে নতুন করে আবার আঙুলের ছাপসহ আরও কিছু তথ্য একত্রিত করে নিবন্ধন তালিকা করা হয়। প্রশ্ন হতেই পারে প্রথমেই কেন সংশ্লিষ্ট এই দুই পক্ষকে অঙ্গীভূত করা হয়নি। অভিজ্ঞ লোক তো পররাষ্ট্র দপ্তরে কম ছিল না। তদুপরি এ সমস্যাটি বাংলাদেশের কাছে নতুন কিছু নয়।  এতে সুবিধা পেল মিয়ানমার। সময় পেল বিশ্ব সমাজকে প্রভাবিত করার জন্য নতুন চাতুর্যপূর্ণ পরিকল্পনা প্রচারের।
 লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা পালিয়ে আসার বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ, ছবি, ভিডিও, সাক্ষাৎকার, সুরত হাল অবস্থা ইত্যাদি বাংলাদেশের হাতে থাকার পরেও কার্যকরভাবে বিশ্ব সমাজে প্রচার করা হয়নি। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ  বাংলাদেশের  মানবিক ভূমিকার জন্য প্রশংসা করেছে; পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেছে। বাংলাদেশ সেই অঙ্গীকারের সদিচ্ছা কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টির ব্যবস্থা নিতে সার্থক হলে আজকের পরিস্থিতি অবশ্যই অন্যরকম হতো। বাংলাদেশ মিয়ানমারের কৌশলের কাছে খুব সুবিধা করে উঠতে পারেনি। তাছাড়া শুরু থেকেই সারা বিশ্ব জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্তির কথা বললেও মিয়ানমার তা কখনোই চায়নি।
প্রায় আট হাজারের মতো ফিরে যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গা নাগরিকের তালিকা মিয়ানমারকে প্রথমে দেয়া হয়। কিন্তু মাত্র পাঁচ হাজারের মতো লোক ফেরত নিতে স্বীকৃত হয়। বাকি লোকদের কোনো যুক্তিতে মিয়ানমার গ্রহণ করতে রাজি নয় সেই প্রশ্নটিই বিশ্ববাসীর সামনে আনা খুব জরুরি ছিল। সেই যুক্তির অসারতা  বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়নি কোনোও অজ্ঞাত কারণে। বর্তমানের সমস্যা না মিটিয়ে ভবিষ্যতে মীমাংসার জন্য রেখে দেয়ার আগে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতির হিসাব দরকার।
প্রত্যাবাসন চুক্তিতে ২৫ আগস্টের পরে আসা ৭-৮ লাখ রোহিঙ্গার বিষয়টি একমাত্র বিবেচনাযোগ্য। তার আগে নানা সময়ে বাংলাদেশে আসা ৩-৪ লাখ রোহিঙ্গার রাখাইনে ফিরে যাওয়া আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় যত সহজে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব তা অতীতে ছিল না। ভবিষ্যতে এমন অবস্থা বিরাজমান থাকবে কিনা তা নিশ্চিতভাবে এখনই বলা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ কৌশল গ্রহণে একটু পিছিয়ে থাকল কি?   
 প্রথম পর্যায়ের দুই হাজার লোকের মধ্যে মিয়ানমারের প্রকৃত নাগরিকের সংখ্যা কয়েকশত।  তারা আবার সংখ্যালঘুর মধ্যে সংখ্যালঘু। কিছুসংখ্যক হিন্দু পরিবার সেখানের বাসিন্দা। এদের কেউ কেউ ভয়ে দেশান্তরী হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।  তাদেরকে আগে পাঠানোর সিদ্ধান্ত কেন নেয়া হলো, বিষয়টি পরিষ্কার নয়। ২০/১১/১৮ তারিখের মিয়ানমার টাইমস্ সংবাদপত্র জানাচ্ছে তালিকা থেকে হিন্দুদের বাদ দেয়া হয়েছে। স্বেচ্ছায় ফেরত যেতে ইচ্ছুকদের সঙ্গে জাতিসংঘ প্রতিনিধি মঙ্গলবার থেকে আলোচনা শুরু করে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে সিদ্ধান্ত হলেও অদৃশ্য কারণে  বাংলাদেশ, মিয়ানমার, জাতিসংঘ যৌথভাবে মতামত যাচাই এবং কাউন্সেলিং এর আয়োজন করেনি। শেষ মুহূর্তে প্রত্যাবাসন আরম্ভের দু’একদিন আগে মতামত যাচাই কি লোক দেখানো? গণমাধ্যম থেকে জানা যায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত করা হয়নি উদ্যোগের   প্রারম্ভ থেকে।
 রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়া, অবাধ চলাফেরা, নিজস্ব বাড়িঘর, জমিজিরেত ফেরত পাওয়ার বিষয়টি সুনিশ্চিত না করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠালে বাংলাদেশের জন্য কি সুবিধা পাওয়া সম্ভব? অং সান সুচিসহ মিয়ানমার সামরিক বাহিনী এ পর্যন্ত তাদের কথা ও কাজে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তরিকতার  কোনো  স্বাক্ষর রাখেনি। চুক্তি ভঙ্গ, ছল-চাতুরির  অতীত নজির যেমন আছে, আছে বর্তমানেরও। এতসব জানার পরেও বাংলাদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কোন ভরসায় ছোট ছোট দলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাবেন নিরাপত্তার বিষয়টি একেবারে আমলে না নিয়ে! জাতিসংঘের অভিবাসী সংস্থা ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গা দলের সার্বিক দায়িত্বে থাকলে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর ফিরে যেতে অনীহার কোনো কারণ থাকত না। যে কোনো সামান্য মানুষই তা বুঝতে পারে।
 শেষ পর্যন্ত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি যখন ভ-ুল হয়ে গেল তখন প্রকাশ হতে থাকল তাদেরকে তিন মাসের রেশন দেয়ার বিষয়, প্রচার হতে থাকল শেষ মুহূর্তে তাদের মতামত নেয়ার বিষয়, প্রকাশ পেল তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে হিন্দু সংখ্যালঘু এবং প্রকৃত রোহিঙ্গা নাগরিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে মিয়ানমারের সুবিধার্থেই সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ- প্রতীয়মান মনে করা হলে কাউকে দোষ দেয়া যাবে না। বাংলাদেশ কেন তিন মাস মিয়ানমারের শিবিরে ভরণ-পোষণের ভার বহন করবে, পরিষ্কার নয় বিষয়টি। সেখানে ফিরে গিয়ে তারা যে আবারও নির্যাতিত হয়ে বাংলাদেশেই আগের মতো ফিরে আসবে না, তার নিশ্চয়তা দরকার।
 রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের আগের দিন জাতিসংঘ জোরালোভাবে বাংলাদেশের কাছে অনুরোধ করেছে তাদের মিয়ানমারে ফেরত না পাঠাতে। কিছুদিন আগে বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান সেনা তত্ত্বাবধানে রাখাইনের কিছু নির্দিষ্ট এলাকা পরিদর্শন শেষে জানিয়েছে, সেখানে ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। বাংলাদেশেরও উচ্চক্ষমতাস¤পন্ন প্রতিনিধি দল অতিসম্প্রতি ঘুরে এসে একই মতামত দিয়েছে।  তার পরেও চীনের সঙ্গে হঠাৎ একটি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পরপরই  তাড়াহুড়ো করে মিয়ানমারের সঙ্গে এই প্রত্যাবাসনের দিন তারিখ ঠিক করা হয়।
 রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। সেই অবস্থার কোনোরকম পরিবর্তন অথবা হুমকি নিরসনের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে- বাংলাদেশ যদি রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠায় বা আজকে যদি ফেরত পাঠাতে পারত তাহলে আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পেত না। মিয়ানমার এমনিতেই নির্লজ্জের মতো, চোরের মায়ের বড় গলার মতো করে নানা রূপে নানা প্রকারে মিথ্যাচার করে আসছে। সে সুযোগটি আরও কয়েকগুণ বেড়ে যেত আজকে রোহিঙ্গাদের একটি পরিবারও যদি মিয়ানমারে ফেরত যেত।
১১-১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয়ের কারণে কক্সবাজারে বহুমুখী সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।  সেখান থেকে ভাসানচরে মাত্র ১ লাখ শরণার্থী স্থানান্তর করে স্থানীয় পরিবেশের কী উন্নতি হবে তা কিন্তু এখনও পরিষ্কার নয়। এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববাসীর কাছে ভিন্ন বার্তা দেয়। আগ্রহীদের মতামত যাচাই সমস্যার আরেকটি ভিন্ন মাত্রা তৈরি করবে। এ পরিকল্পনা কারা, কেন করেছে, খোলাসা নয়। দুর্নীতির কারণে  বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে রোহিঙ্গাদের বিদেশ যাওয়া ঠেকানো যাচ্ছে না। সৌদি আরব রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে না পাঠিয়ে বাংলাদেশে পাঠাবে। তারা প্রকৃতই মিয়ানমারের নাগরিক হয়েও বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী। রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ¯পর্শকাতর। যেনতেন রূপে তৃতীয় কোনো দেশের চাপে, মিয়ানমারকে নির্ভরযোগ্য ভেবে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সুবিধা নিশ্চিত না করে, সংকটের সম্ভাবনা দূর না করে, পরবর্তী কার্যক্রম না নেয়া এ মুহূর্তে সবচেয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। বিলম্বিত হলেও কল্যাণকর স্থায়ী সমাধানই লক্ষ্য হওয়া উচিত।
karimreza9@gmail.com

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রতিবেদন
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.