[প্রবাস প্রতিবেদন] প্রবাসীদের ভোটাধিকার দরকার নেই

Print Friendly and PDF

পলাশ রহমান

দেশে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তোড়তোড় চলছে। ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে এই সময়টা এলেই সবার রক্তচাপ বেড়ে যায়। মনে মগজে নানা রকমের আশঙ্কা ভর করে। সব থেকে বড় আশঙ্কা হলো- মানুষ ভোট দিতে পারবে তো? দেশের মানুষ তাদের স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করতে পারবে তো?
এই আশঙ্কা আমাদের দেশে সবসময়ই ছিল। আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার অধীনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে আশঙ্কা আরও বেড়ে গেছে। দেশের একটা শ্রেণী এখন বিশ্বাস করে ফেলেছে, ক্ষমতায় থাকতে জনভোট বা জনসমর্থন দরকার হয় না। বিনা ভোটেও নির্বাচিত (!) হওয়া যায়।
জানি না, এবারের নির্বাচন মানুষকে এই ক্ষতিকর বিশ্বাসের জায়গা থেকে বের করে আনতে পারবে কী-না। শাসকশ্রেণী মানুষের বিশ্বাস পরিবর্তন করতে চেষ্টা করবে কী-না। মানুষ তাদের পছন্দের প্রতীকে বা প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে কী-না। তবে আলামত দেখে মনে হচ্ছে পারবে না। কারণ আমাদের দেশের কোনো দলের রাজনীতিকরাই এখনও এতটা শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারেননি। তারা দেশের মানুষকে সম্মান করতে শেখেননি। জনরায়ের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস কোনোটাই তাদের নেই। যে কারণে স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও ভোট এলেই মানুষের মধ্যে আশঙ্কা বেড়ে যায়। মানুষ ভয় পায়।
কে যে বাংলাদেশের নির্বাচনকে উৎসবের সঙ্গে তুলনা করেছিল! ভোট কোনো উৎসবের ব্যাপার না। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় হলো ভোট। মানুষকে ভোটের গুরুত্ব না বুঝিয়ে এটাকে উৎসবের সঙ্গে তুলনা করে হালকাভাবে দেখার বা দেখানোর চেষ্টা কোনোভাবেই ভালো কোনো সিদ্ধান্ত নয়। দেশের সাধারণ মানুষকে ভোটের গুরুত্ব বোঝাতে হবে। যতদিন দেশের মানুষ নিজের অধিকার সচেতন না হবে, ততদিন পরিবর্তন আসবে না।
আমাদের দেশে ভোট এলেই মানুষ খুন হয়। কালো টাকার ছড়াছড়ি বেড়ে যায়। অবৈধ লেনদেন বেড়ে যায়। মাদক ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। ভোট জালিয়াতি হয়। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ভয়ে থাকেন। প্রার্থীরা হলফমানায় মিথ্যা তথ্য দেন। ভুঁরিভুঁরি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেন। প্রায় সব দলের প্রার্থী নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করেন। নির্বাচনী ইশতেহারের লেখার সঙ্গে তাদের কাজের কোনো মিল পাওয়া যায় না। এগুলোর কোনোটাই উৎসবের অংশ হতে পারে না। বরং বলা যায়, অনৈতিকতার মহোৎসব।
ভোট যদি উৎসব হতো- সবাই স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারত। ভোটের গুরুত্ব বুঝত। সরকার ভোট জালিয়াতি করত না। কালো টাকা, অবৈধ টাকার ছড়াছড়ি হতো না। মাইক লাগিয়ে প্রার্থীরা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতেন না। নির্বাচনী ইশতেহারের লেখা এবং তাদের কাজে মিল থাকত। সব থেকে বড় বিষয় হলো মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হতো। মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থী বা দলের প্রতীকে ভোট দিতে পারত।
চা-পান খাওয়া, কিছু আর্থিক সুবিধা নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করা, মিটিং মিছিল হাঙ্গামা করাকে যদি কেউ ‘ভোট উৎসব’ মনে করেন সেটা হবে মারাত্মক ভুল। যে ভুল চর্চা দীর্ঘদিন আমাদের দেশে চেলে এসেছে। ভোটকে সত্যিকারের উৎসবে রূপ দিতে হলে সবকিছুর আগে মানুষকে ভোটের গুরুত্ব বোঝাতে হবে। গ্রহণযোগ্য, টেকসই এবং স্বচ্ছ নির্বাচন পদ্ধতি বের করতে হবে। নয়তো ভোট উৎসবের নামে অনৈতিক দুষ্টু বুদ্ধির চর্চা মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলবে। এক সময় মানুষ ঘুরে দাঁড়াবে। যার পরিণতি হতে পারে খুবই করুণ।
মনে রাখা দরকার, পাকিস্তানের শত অত্যাচার, জুলুমেও বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার কথা চিন্তা করেনি। কিন্তু তারা যখন মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছিল, জনরায়ের প্রতি সম্মান দেখায়নি, তখনই দেশের মানুষ চূড়ান্ত বিক্ষুব্ধ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
এই ইতিহাস বঙ্গবন্ধুকন্যার মনে থাকা উচিত।

২.
বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশ দেশের বাইরে থাকে। প্রবাসী জীবনযাপন করে। ইন্টারন্যাশনাল ইমিগ্রেশন রিপোর্ট অনুযায় এই সংখ্যা ৭০ থেকে ৮০ লাখ। তবে বাস্তবতা বলে আরও অনেক বেশি। যদিও সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই, তবু বিভিন্ন সূত্রের ওপর নির্ভর করে ধারণা করা যায় এই সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি হবে।
আমরা যদি ইন্টারন্যাশনাল ইমিগ্রেশন রিপোর্ট মেনে নিই, তার পরেও বিশ্বের মোট ১৫৭টি দেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা মোট জনগোষ্ঠীর ৪ থেকে ৫ শতাংশ। যার গাণিতিক হিসাব হলো- দেশের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা থেকে গড়ে ২৩ হাজার মানুষ প্রবাসে থাকে।
দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি প্রবাসীদের অবদান কী তা নতুন করে বলার কিছু নেই। শুধু এতটুকু জানিয়ে রাখতে চাই- সর্বশেষ অর্থবছরে প্রবাসীরা বাংলাদেশে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠিয়েছে। যা আমাদের দেশি উৎপাদনের প্রায় ৮ শতাংশ। মোটা অঙ্কের এই বৈদেশিক আয়ের পেছনে আমাদের সরকারের কোনো সহযোগিতা বা বিনিয়োগ নেই।
বিশাল সংখ্যার প্রবাসীদের ভোটাধিকার নেই। তারা কেউ বিদেশে থেকে ভোট দিতে পারে না। যদিও দেশের উচ্চ আদালত ১৯৯৮ সালে প্রবাসীদের ভোটাধিকার সংবিধান স্বীকৃত বলে ঘোষণা দেয়। এর পরে কেটে যায় কুড়ি বছর। প্রবাসীদের ভোটাধিকার দেয়া হয়নি।
মজার ব্যাপার হলো বিদেশে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ প্রায় সকল দলের রাজনৈতিক শাখা রয়েছে। তারা নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন শর্ত অমান্য করে প্রবাসীদের মধ্যে দলীয় রাজনীতির বিস্তার করে রেখেছে, কিন্তু প্রবাসীদের ভোটাধিকার দেয় না। অথচ ভারত সম্প্রতি তাদের নির্বাচনী আইন সংস্কার করে প্রবাসীদের ভোটাধিকার দিয়েছে। পাকিস্তানের প্রবাসীরা তাদের দেশের সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়েছে। শুধু ভোট দিতে পারে না আমাদের দেশের প্রবাসীরা।
কেউ কেউ হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, দেশের মানুষেরই তো ভোটাধিকার নেই, প্রবাসীদের ভোটাধিকার আসবে কোথা থেকে? দেশের মানুষ ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে না, ভোট দিতে পারে না। যে দেশে এখনও পর্যন্ত বিনা ভোটে এমপি হওয়া যায়, সংসদে যাওয়া যায়। যে দেশের মানুষ এখনও পর্যন্ত একটা টেকসই, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পারে নাই, সেই দেশের প্রবাসীদের ভোটাধিকার চাওয়া কাজলের কৌতুকের মতো শোনায়।
৩.
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি প্রবাসীদের ভোটাধিকার দরকার নেই। কোনো প্রকারের রাজনৈতিক অধিকার ছাড়াই আমাদের প্রবাসীরা যে মাত্রায় দলীয় রাজনীতি করে, তাতেই অনেক সময়ে টেকা মুশকিল হয়ে যায়। এর পরে যদি ভোটাধিকার দেয়া হয়, তবে যে কী পরিণতি হবে তা আল্লাহ ছাড়া কেউ বলতে পারেন না।
প্রবাসীদের ভোটাধিকার দেয়ার অনেক নেতিবাচক দিক আছে। এর মধ্যে এক নম্বরে হলো আমাদের দেশেই এখনও পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য কোনো নির্বাচন পদ্ধতি নেই। নির্বাচন এলেই মানুষ আশঙ্কায় পড়ে যায়। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে যায়। এই অবস্থায় যদি দেড় কোটি প্রবাসীকে ভোটাধিকার দেয়া হয়, তবে আশঙ্কা আরও বাড়বে। ভোট জালিয়াতি, ভোট গণনায় দুর্নীতি, হাঙ্গামা আরও বৃদ্ধি পাবে।
বিদেশে প্রবাসী রাজনীতিকদের উৎপাত এবং দেশি রাজনীতিকদের আনাগোনা বৃদ্ধি পাবে। দেশের অর্থপাচার, প্রবাসীদের খরচ বেড়ে যাবে। এতে দেশের অর্থভা-ার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিদেশে বাংলাদেশি কম্যুনিটির এবং দেশের বদনাম হবে।
কোন পদ্ধতিতে প্রবাসীরা ভোট প্রদান করবে, প্রক্সি নাকি পোস্টাল? নাকি ই-ভোট প্রদান করবে? এসব নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হবে। ই-ভোটের প্রতি বিশ্বের কোনো দেশেরই আস্থা নেই। পোস্টাল ভোট সময়মতো পৌছায় না। কোনো কোনো দেশে প্রক্সি ভোট জনপ্রিয় হলেও আমাদের দেশে হবে বলে মনে হয় না। বরং খরচ বাড়বে। ভোট বেহাত হবে। ভোট বেচাকেনা বাড়বে। প্রবাসীদের পরিবারে অশান্তি বাড়বে। প্রবাস কম্যুনিটিতে, দূতাবাসে উৎপাত বৃদ্ধি পাবে।
ভোটাধিকারের আগে প্রবাসীদের অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করা দরকার। প্রবাসীরাও যে বাংলাদেশের নাগরিক, তারাও যে মানবাধিকারের আওতায় পড়ে তা নিশ্চিত করা দরকার।
সংসদে প্রবাসী প্রতিনিধি থাকা দরকার। সংরক্ষিত নারী আসনের মতো সংরক্ষিত প্রবাসী আসন থাকা দরকার।
প্রবাসীদের জ্ঞানগত অভিজ্ঞতা এবং আর্থিক সহযোগিতা দেশের সত্যিকারের উন্নয়নে ব্যয়ের নিশ্চয়তা সৃষ্টি করা দরকার।
ভারতের রাষ্ট্রপতি তার দেশের প্রবাসীদের সম্মানে ভোজ দিতে পারেন, আমাদের রাষ্ট্রপতি পারেন না কেন?
মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তাদের দেশের প্রবাসীদের জ্ঞানগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে বেছে বেছে প্রবাসীদের দেশে ডাকতে পারেন, কাজে লাগাতে পারেন, তাদের জ্ঞানগত অভিজ্ঞতা জানার চেষ্টা করতে পারেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রীরা পারেন না কেন? তারা কেন বিদেশে এসেও দলের গ-ি ভেঙে দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না?
বিদেশে আমাদের দেশের দূতাবাসগুলোর কর্মচারী লেভেলে প্রবাসীদের যোগ্য সন্তানদের চাকরির নিশ্চয়তা সৃষ্টি করা দরকার।
দূতাবাসের অবৈতনিক কনসাল জেনারেল প্রবাসীদের মধ্যে থেকে নিয়োগ দেয়ার ট্র্যাডিশন সৃষ্টি করা দরকার।
ঢাকার এয়ারপোর্টে প্রবাসী হয়রানি বন্ধ করা দরকার। তাদের অসদাচরণ বন্ধ করা দরকার।
প্রবাসীদের মৃতদেহ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে নেয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। ঢাকার এয়ারপোর্টে লাশ নিয়ে সৃষ্টি করা জটিলতার অবসান হওয়া দরকার।
দেশে প্রবাসীদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার নিশ্চয়তা দরকার।
প্রবাসী ব্যাংক সচল করা দরকার। এই ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী লোন এবং পেনশন স্কিম চালু করা দরকার।
দূতাবাস সংক্রান্ত কাজের খরচ কমানো দরকার। বিপদে পড়া প্রবাসীদের সহায়তায় সরকারি উদ্যোগ নিশ্চিত হওয়া দরকর।
বিদেশ গমনে আগ্রহীদের ভাষা এবং কাজের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। এসব ক্ষেত্রে খরচ কমানো দরকার।
কাজের সন্ধানে বিদেশ যাত্রীদের খরচ কমানো দরকার। বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নেয়া শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরিয়ে নেয়া এবং তাদের মেধা কাজে লাগানোর পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার।
দেশে প্রবাসীদের বিনিয়োগের নিশ্চয়তা সৃষ্টি করা দরকার। তাদের সম্পদ রক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার।
কোনো প্রবাসী সর্বস্বান্ত হয়ে দেশে গেলে তার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকা দরকার।
পাসপোর্ট ১০ বছর মেয়াদি করা দরকার। পাসপোর্ট নবায়ন এবং সার্টিফিকেট প্রদান সহজ করা দরকার। দূতাবাসগুলোয় নগদ অর্থগ্রহণের পরিবর্তে অনলাইনে/ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থগ্রহণের ব্যবস্থা চালু করা দরকার।
দেশভিত্তিক ভাষা এবং কাজের প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো নারী শ্রমিক বিদেশে পাঠানো বন্ধ করা উচিত।
মোদ্দা কথা হলো, প্রবাসীদের ভোটাধিকারের আগে অন্য অধিকারগুলো নিশ্চিত হওয়া দরকার।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রবাসে
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.